|
|
|
চিরঞ্জীব ইমাম খোমেনী (রঃ)
ঐ আসে জড়ীন সড়কে লাখো জনতার নাচছে হৃদয়বীণঃ আলবুর্জের চূড়ায় চূড়ায় কেঁপে ওঠা সেই দীপ্ত ঈদের দিন গ্রানাডার লাল মিনারে কেঁপে ওঠা সেই দীপ্ত ঈদের দিন ইউফ্রেটিস আর তাইগ্রীস তীরে কেঁপে ওঠা সেই দীপ্ত ঈদের দিন দুয়ারে আমার আসলো কি সেই দিন দুয়ারে আমার আসলো এ কোন্ দিন হ্যাঁ, সেই দীপ্ত ঈদের দিনটি ছিল ১৯৭৯ সালের ১১ ই ফেব্রুয়ারী । ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয় দিবস । আর এ বিপ্লবের মহানায়ক ছিলেন মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) । আজ আমরা তাঁর সাফল্যের কিছু কারণ তাঁরই নেতৃত্বের কিছু বৈশিষ্ট্য, ব্যক্তি জীবন ও ব্যক্তিত্বের মধ্যে অনুসন্ধান করবো । দুনিয়ার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পৃথিবীর অধিকাংশ জননন্দিত নেতাই জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেননি, এমনকি অনেকে জননন্দিত হবার পরেও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে, বা অন্য কোনো বিচ্যুতির কারণে জনগণের কাছে এতো ধিকৃত হয়েছেন যে, জনগণ তাদের অতীত কৃতিত্ব বা অবদানকে খুব একটা মনে রাখেনা । কিন্তু ইমাম খোমেনী (রঃ) তাঁর জনপ্রিয়তাকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ধরে রাখতে পেরেছেন এবং মৃত্যুর পরও তাঁর মহত্ব ও কীর্তিগাঁথার স্বর্গীয় প্রভাব দিন দিন বাড়ছে । এমনকি ইসলাম ও ইমাম খোমেনী (রঃ)’র আদর্শের বিরোধীরাও বিশ্বব্যাপী এ ইমামের ঐতিহাসিক ও অসাধারণ প্রভাবের স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছেন । খ্যাতনামা ধর্মতত্ত্ববিদ শহীদ আয়াতুল্লাহ মোতাহারী তাঁর ‘‘ বিগত একশ বছরের ইসলামী আন্দোলন ” শীর্ষক বইয়ে ইমাম খোমেনী (রঃ) সম্পর্কে লিখেছেনঃ তাঁর নাম, স্মৃতিশক্তি, কথাবার্তা, আবেগের তীব্রতা, অদম্য ইচ্ছাশক্তি, দৃঢ়তা, সাহস, স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গী এবং গভীর ঈমান- এসবই সর্বস্তরের জনগণের মুখে মুখে । তিনি হচ্ছেন শ্রেষ্ঠতম ও মহত্তম বীর এবং ইরানী জনগণের নয়নমণি । রাসূলে করীম (সাঃ)’র পবিত্র বংশধারায় তিনি হচ্ছেন এমন এক ব্যক্তি যিনি সকল বিকৃতি ও মিথ্যা দাবীর প্রতি অস্বীকৃতি জানান । তিনি জনগণকে বিপ্লবের সারবত্তায় অনুপ্রাণিত করেছেন এবং সমাজ জীবনের সবক্ষেত্রে তাঁর প্রভাব অনুভূত হয়েছে । ” কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা না হয়েও , কিংবা কোনো গেরিলা দল গঠন না করেও এবং বিদেশী শক্তির অর্থ বা সামরিক বা অন্য যে কোনো সাহায্য ছাড়াই তিনি ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে কিভাবে সফল করেছিলেন তা এক এক মহাবিস্ময় । কিন্তু মরহুম ইমামকে এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেনঃ মহান আল্লাহর নির্দেশেই তা সফল হয়েছে, আমার চেষ্টায় নয় । আসলে সংগ্রামী আলেম পরিবারের সন্তান হিসেবে খোদামুখী চিন্তার অনুরাগী ইমাম খোমেনী (রঃ) ছিলেন মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল এবং অনুগত । তাঁর সমস্ত তৎপরতার লক্ষ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন । তিনি নিজেই এক সময় বলেছিলেনঃ হে আল্লাহ ! বিশ্বের কেউ যদি নাও জেনে থাকে, আপনি তো এটা জানেন, আমরা শুধু আপনার ধর্মের পতাকাকে উঁচু করে তুলে ধরার জন্যেই বিপ্লব করেছি । মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) এর বিশেষ উদ্দীপনায় বাণী মানুষের মনে ভীষণ প্রভাব ফেলত। মানুষ ইমামের বাণীতে উজ্জবিত হতো। এর কারণ হচ্ছে তাঁর আহবান ছিল ইসলামের গৌরবময়, উদ্দীপনাময় ও ঐতিহাসিক তাহজীব-তমুদ্দুনের গভীর থেকে উৎসারিত । তাঁর আহবান কোনো আগন্তুকের আহবান বা সর্বাধুনিক কোনো বিদেশী তত্ত্ব বা চিন্তাধারার সংস্করণ ছিলনা । তাঁর আহবান ছিল মুসলমানদের কাছে অতি পরিচিত আহবান। এ আহবান ছিল হেরা, মক্কা, মদীনা, উহুদ, কাদেসিয়া, জেরুজালেম, জিব্রাল্টার প্রণালী ও ক্রুসেডে উচ্চারিত বাণীর প্রতিধ্বনি । ইসলামের গৌরবময় ইতিহাসের পাতায় দীর্ঘদিন ধরে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত এ আহবান ছিল জিহাদে জীবন বিলিয়ে দেয়ার আহবান । ইমাম খোমেনী (রঃ) মোহাম্মদী ইসলামের এ ঐতিহাসিক ধারার আহবায়ক হিসেবেই কথা বলতেন , কোনো গোত্র, দল বা পার্টি বা গোষ্ঠীর হয়ে কথা বলতেন না । এমনকি তিনি আলেম সমাজের প্রতিনিধি হয়েও কথা বলতেন না । বরং সমগ্র মুসলিম জাতির উদ্দেশ্যেই তার বক্তব্য ছিল উচ্চকিত । আর এ জন্যেই তাঁর কথার আবেদন ছিল খুবই ব্যাপক ও স্থায়ী । তাঁর আহবানে সব আদর্শের অনুসারী বা সব দল বা গ্রুপের মানুষই এক হয়ে যেত এবং তিনি হয়ে পড়তেন ঐক্যের অনির্বাণ প্রতীক । তিনি ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক দলের কাঠামোর মতো কোনো কেন্দ্রীয় ক্ষমতাধর কমিটিও প্রতিষ্ঠা করেননি । বরং সমগ্র ইরানের গ্রামে গ্রামে মসজিদ ও আলেমকেন্দ্রীক স্বায়ত্বশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এসব আলেমদের থেকেই পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ইসলামী বিপ্লবী পরিষদ ও ইসলামী সরকার গঠিত হয় । জীবনের প্রথম ত্রিশ বছর থেকেই ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে অনেক খাঁটি আলেম গড়ে তুলেছিলেন মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) । আর এ আলেমরা গড়ে তুলেছিলেন ভবিষ্যৎ সমাজ বিপ্লবের হাজার হাজার যোগ্য কর্মী । ইমাম খোমেনী (রঃ) সহ এ মহান আলেমগণ ছিলেন প্রজ্ঞাবান, সাহসী এবং সময়ের গতি প্রকৃতি বুঝতে সক্ষম । সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁদের সহমর্মিতা এবং তাদের আকুতির মাধ্যমেই ঘটেছে ইসলামের জাগরণ । তাঁরা অবসাদ ও হতাশাসহ সমস্ত দূর্বলতা বা শয়তানী শক্তিকে পরাভূত করেছিলেন । তাদের দ্বিধাহীন, নিঃশঙ্ক ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ ইতিহাসে তাঁদেরকে চিরঞ্জীব করে রাখবে । মরহুম আয়াতুল্লাহ তালেকানী বলেছেন-আমি যখনই উৎসাহ হারিয়ে মুষড়ে পড়তাম তখনই ইমাম খোমেনীর কাছে যেতাম এবং সেখান থেকে আশা ও দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে অনুপ্রাণিত হয়ে ফিরতাম । মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)’র আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও সাফল্যের একটি বড় কারণ হলো তিনি ছিলেন জীবনের সব ক্ষেত্রে খোদাপ্রেমিক, খোদা-নির্ভর, লোভ-লালসাহীন, সাদা সিধে জীবনে অভ্যস্ত এবং বিনয়ী সাধক বা আরিফ । বিপ−বের চূড়ান্ত পর্বের উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা যখন সারা বিশ্বের পর্যবেক্ষকদের মধ্যেও টেনশান বা অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল তখনও তাঁর মধ্যে চিন্তিত হবার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি । অর্ধকোটিরও বেশী জনতা যখন তাঁকে তেহরানে সম্বর্ধনা জানায় তখনও তিনি আনন্দে আত্মহারা হননি । তিনি নিজেই বলেছেন, এ বিশাল জনতা যদি আমার বিরোধী হয়ে যায়, তাহলেও আমার মধ্যে বিশেষ কোনো অনুভূতি জাগবেনা এবং এখন আমাকে সমর্থন করার কারণেও নিজেকে বিশেষ কিছু মনে করছিনা । এর কিছুদিন আগে বিপ্লব সফল হবে কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ইমাম খোমেনী (রঃ) বলেন, আমরা আমাদের দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি মাত্র । সাফল্য ও ব্যর্থতা আল্লাহর হাতে নিবদ্ধ । তিনি বলতেন, আমাকে নেতা বলবেন না,আমি এ জাতির অসংখ্য খাদেম বা সেবকদের মধ্যে একজন নগণ্য খাদেম মাত্র । বিদেশী মেহমানদের মধ্যে আলেম ওলামা ও নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদেরকে তিনি আগে ভাগে সাক্ষাত দিতেন । সরকারী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং সাম্রাজ্যবাদের অনুচরদের তিনি খুব কমই সময় দিতেন । ইমাম প্রায়ই শহীদ পরিবারের সদস্য, এতিম ছেলে মেয়ে , পঙ্গু মুজাহিদ ও মজলুম জনতার সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে মিলিত হতেন । ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও ইমাম সরাসরি ক্ষমতা প্রয়োগ করেননি । দৈনন্দিন সরকারী কাজের সাথে জড়িত হয়ে ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণের লোভ তার বিন্দুমাত্র ছিলনা বরং নীরবে নিভৃতে মহান প্রভুর দরবারে সিজদাবনত হয়ে থাকা পছন্দ করতেন তিনি । তাই বলে তিনি সংসার ত্যাগী বা বাস্তব জগত থেকে দূরে থাকতেননা । নিখাদ ইসলামী আধ্যাত্মিকতায় উজ্জ্বীবিত ইমাম বলতেন,যখনই জ্ঞান অর্জনের পথে দু'কদম অগ্রসর হবে তখন আত্মশুদ্ধির দিকেও দু’কদম অগ্রসর হবে । মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) আজানের সাথে সাথে নামাজ আদায়ের জন্যে অগ্রসর হতেন । ইমামের ঘনিষ্ঠ সহচর হুজ্জাতুল ইসলাম আনসারী বলেছেন, পঞ্চাশ বছরের মধ্যে ইমামের তাহাজ্জুদ নামাজ কখনো বাদ যায়নি । যে রাতে তিনি প্যারিস থেকে তেহরানে আসেন সে রাতে বিমানের সকল যাত্রী নিদ্রিত ছিল, কিন্তু ইমাম একাকী বিমানের দ্বিতীয় তলায় নামাজে মশগুল ছিলেন ।আল্লাহর দরবারে মুনাজাতের সময় তাঁর দুচোখ হতে ঝরতো অশ্র-বৃষ্টি । হাসপাতালেও তিনি আল্লাহর ধ্যানে মশগুল থাকতেন এবং নত মস্তকে ক্রন্দন করে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করতেন। ছাত্র জীবন থেকেই ইমাম খোমেনী (রঃ) ছিলেন শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনের প্রতীক । তার সব কিছু ছিল নির্দিষ্ট সময় ভিত্তিক । মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রুটিন অনুযায়ী কাজ করতেন । তাঁর কোনো কাজ বা কোনো স্থানে তাঁর উপস্থিতি দেখে মানুষ সময় নির্ধারণ করে বলতে পারতো, এখন অতোটা বাজে । ইমাম খোমেনী (রঃ) বায়তুল মালের সম্পদ রক্ষাকে নিজ জীবনের চেয়েও বেশী গুরুত্ব দিতেন । ইরাকের নাযাফে নির্বাসনে থাকা অবস্থায় ইমামের বড় ছেলে হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়েদ মোস্তফা খোমেনী শাহাদত বরণ করলে তার পরিবারের লোকেরা ইমামের ঘরের টেলিফোনের মাধ্যমে তেহরানে এ খবর পাঠানোর চেষ্টা করেন । কিন্তু ইমাম ঐ নাজুক অবস্থায়ও তাঁর পরিবারের লোকদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন যে ঘরের টেলিফোনটি বায়তুলমালের সম্পদ, তাই ইমামের ব্যক্তিগত বা পরিবারের কাজে এ টেলিফোন ব্যবহার করা জায়েজ হবে না । আল্লাহর হুকুম আহকাম বাস্তবায়নেও তিনি ছিলেন আপোসহীন । ইমামের অতি ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি কোনো মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির জন্যে ইমামের কাছে সুপারিশ নিয়ে এলে ইমাম তাকে বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির উর্ধ্বে সৃষ্টির সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দিতে পারবোনা এবং আল্লাহ পাকের বিধানের উর্ধ্বে বন্ধুত্বের সম্পর্ককে প্রাধান্য দেয়াও সম্ভব নয় । ইমাম খোমেনী নিজ পরিবারের কাউকে রাষ্ট্রের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হতে দেননি । তিনি বলতেন, ইসলামী বিপ্লব করা হয়েছে মজলুম ও বঞ্চিত মানুষের উনড়বয়নের জন্যে আমাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্যে নয় । ধৈর্যের দিক থেকেও তিনি ছিলেন অসাধারণ । পুত্র মোস্তফা খোমেনীর শাহাদতের খবর শুনে তাঁর স্ত্রী যখন অত্যধিক শোকাভিভুত ইমাম সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত নিজ হাতে ঘরের প্রয়োজনীয় সব কাজ সেরে নেন এবং বাড়ীর সবাইকে সান্তনা দেন । পারিবারিক জীবনেও ইমাম ছিলেন বিনয়ী । ব্যক্তিগত কাজগুলো নিজেই করতেন এবং আদেশের সূরে কারো সাথে কথা বলতেন না । কোনো মজলিশ বা সমাবেশে তিনিই সবার আগে অন্যদের সালাম দিতেন । ইসলামী ইরানের বর্তমান রাহবার বা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ উজমা খামেনী বলেছেন, নবীগণ ও নিষ্পাপ ইমামগণ ছাড়া ইমাম খোমেনী (রঃ)’র মতো উন্নত চারিত্রিক গুণাবলীর অধিকারী মহান ব্যক্তিত্ব ইতিহাসের পাতায় খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে । তাঁর মর্যাদা ধারণার অতীত । তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান মুসলিম হিসেবে এক চমৎকার আদর্শ এবং সত্যিকার মুসলিম নেতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ । তিনিই পুনরায় ইসলামকে গৌরবান্বিত করেছেন এবং কোরআনের ঝান্ডাকে দুনিয়ার বুকে তুলে ধরেছেন । #
|
|