
পাশ্চাত্যে রাসূলের অবমাননা ও বিশ্বব্যাপী তীব্র প্রতিবাদ
পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমগুলো মনে করে,
তারা যেকোন ধরনের কথা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা
রাখে ৷ তাদের মতে, তাদের বক্তব্য যদি দেড়শ
কোটি মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে তবুও তারা সে বক্তব্য
প্রকাশের ব্যাপারে স্বাধীন ৷ আসলে এটা হচ্ছে বাক স্বাধীনতার
অপব্যবহার ৷ ইউরোপীয় গণমাধ্যম যতখানি বাক স্বাধীনতার দাবি করছে
ততখানি স্বাধীনতা ইউরোপের কোথাও নেই৷ এসব গণমাধ্যমের অধিকাংশই
বৃহত্ কোন কোম্পানীর দ্বারা পরিচালিত,
যেসব কোম্পানী কেবল তাদের মুনাফা উঠিয়ে নেয়ার চিন্তায় মগ্ন৷ কাজেই
পশ্চিমা গণমাধ্যম তাদের মালিকদের বা সেসব দেশের সরকারের বিরুদ্ধে
কোন কথা বলতে পারেনা৷ পর্তুগালের বিশিষ্ট লেখক ও সাহিত্যে নোবেল
বিজয়ী হোযা সারামাগো বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর অবমাননাকার
কার্টুন প্রকাশের ব্যাপারে বলেন, 'ঐ
কার্টুনিস্ট যদি তার পত্রিকার মালিকের বিরুদ্ধে কার্টুন আঁকতো তবে
তাকে বহিস্কার করা হতো ৷ ফলে দেখা যাচ্ছে,
আসল বিষয় মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা সেন্সরের অনুপস্থিতি নয়,
বরং মূল ব্যাপার হচ্ছে, এ
কাজ অত্যন্ত অপছন্দনীয়, নিন্দনীয় এবং
নির্বুদ্ধিতামূলক ৷ '
পশ্চিমা দেশগুলোতে বাক স্বাধীনতা যেসব কারণে প্রশ্নের সম্মুখীন
সেসবের অন্যতম হচ্ছে,
হোলোকাস্ট বা হিটলার বাহিনীর হাতে কথিত ৬০ লাখ
ইহুদীর হত্যাকান্ডের ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করার বিরুদ্ধে
নিষেধাজ্ঞা ৷ বর্তমানে ইউরোপ বা আমেরিকায় কারো পক্ষে হোলোকাস্টের
কল্পকাহিনীর বিরোধিতা করে কোন কথা বলা বা কোন বই প্রকাশ করা সম্ভব
নয় ৷ এমনকি কেউ যদি অকাট্য দলিল প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে
হোলোকাস্টকে অস্বীকার করে, তবুও তার পক্ষে
তা প্রকাশ করা সম্ভব নয় ৷ পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে একাজ করা অপরাধ এবং
কেউ তা করলে তাকে বিচারের সম্মুখীন হতে হয় ৷ হোলোকাস্টের
কল্পকাহিনীর ব্যাপারে প্রশ্ন তোলার জন্য এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকজন
পশ্চিমা লেখক ও গবেষকের বিচার করা হয়েছে এবং কয়েকজনের বিরুদ্ধে
এখনো বিচার চলছে ৷ ইরানের প্রেসিডেন্ট ডক্টর মাহমুদ আহমাদিনেজাদ এক
বক্তব্যে এ সম্পর্কে বলেছেন,পশ্চিমা কিছু
দেশ এবং বিশেষ করে বড় শয়তান আমেরিকার দৃষ্টিতে রাসূলের অবমাননায়
দোষের কিছু নেই৷ কিন্তু যে হোলোকাস্টের ঘটনাকে পূঁজি করে
ইহুদীবাদীরা গত ষাট বছর ধরে নির্যাতিত ফিলিস্তিনীদের হত্যা করে
চলেছে, সেই কল্পকাহিনীর ব্যাপারে কথা বললেই
অপরাধ হয়ে যায় ৷
পশ্চিমা দেশগুলোতে যে বাক স্বাধীনতা নেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়
সেখানকার মুসলমানদের অবস্থা দেখে ৷ ইউরোপ ও আমেরিকায় মুসলমানদেরকে
নানাভাবে হয়রানি করা হয় ৷ এমনকি জার্মানী ও ফ্রান্সের মত দেশে
মুসলমান মেয়েরা হিজাব বা ওড়না মাথায় দিয়ে স্কুল কলেজে বা কোন
সরকারী অফিস আদালতে প্রবেশ করতে পারেনা ৷ জার্মানীর বাডেন
উর্তেমবার্গ প্রদেশে মুসলমান নাগরিকত্বপ্রার্থীদের জন্য একটি
নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে ৷ ঐ প্রদেশের সরকার মুসলমানদের জন্য একটি
বৈষম্যমূলক প্রশ্নপত্র তৈরি করেছে ৷ কোন মুসলমান জার্মানীর ঐ
প্রদেশে থাকার আবেদন করলে ৩০টি প্রশ্ন সম্বলিত ঐ প্রশ্নপত্র তার
হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলা হয়,
সে যদি সবগুলো প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে না পারে
কিংবা ভুল ও অসম্পূর্ণ উত্তর দেয় তবে তাকে জার্মানীর নাগরিকত্ব
দেয়া হবেনা৷ চলতি ২০০৬ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে
নাগরিকত্বপ্রার্থীদের ব্যাপারে এই আইন চালু করা হয়েছে এবং এ আইন
কেবল মুসলমানদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে ৷
তবে এবার ইউরোপীয় দেশগুলোতে বিশ্বনবীর অবমাননার বিরুদ্ধে
বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃনা প্রকাশ করেছে ৷ অবশ্য
ইসলাম অবমাননাকারীরাও জানে যে, তাদের এ
ঘৃন্য কাজের বিরুদ্ধে মুসলমানরা কিছুটা প্রতিবাদ ও হৈ চৈ করবে ৷
কিন্তু এবার মুসলমানরা যে প্রতিবাদ জানিয়েছে তা ছিল নজীরবিহীন এবং
এতে পশ্চিমারাও হতবাক হয়ে গেছে৷ অধিকাংশ মুসলিম দেশে এবং অনেক
অমুসলিম দেশেও রাসূলের অবমাননার বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে৷
এমনকি ইউরোপীয় দেশগুলোতে এবং আমেরিকায়ও রাসূলের অবমাননার মত ঘৃন্য
চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ হয়েছে৷ এসব
বিক্ষোভের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল প্রিয়নবীর অবমাননার বিরুদ্ধে মুসলিম
তরুনদের ব্যাপকহারে স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহন ৷ এ থেকে প্রমাণিত হয়েছে
যে, মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন তাদের জন্য তেমন কোন ফল বয়ে আনেনি ৷ অন্যদিকে
ডেনমার্কসহ ইউরোপীয় দেশগুলোতে রাসূলের অবমাননার ফলে মুসলমানদের
মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বৃদ্ধি পেয়েছে ৷ সবগুলো মুসলিম দেশের জনগণ
তাদের দেশগুলোতে ডেনমার্কসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের পন্য বর্জনের
আহবান জানিয়েছে ৷ এছাড়া অধিকাংশ মুসলিম দেশের সরকার রাসূলের
অবমাননাকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে
এবং কোন কোন মুসলিম দেশ ঐসব ইউরোপীয় দেশ থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতদের
প্রত্যাহার করে নিয়েছে ৷
মানবজাতিকে হেদায়েত বা সঠিকপথের সন্ধান দেয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বনবীর
ভূমিকা এবং তার জীবনাচরণ, তার অবমাননার
বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মুসলমানদের উত্সাহিত করেছে৷ ইউরোপীয়
পত্রিকাগুলো এমন একজনকে সন্ত্রাসী হিসেবে তুলে ধরেছে যিনি ছিলেন
দয়া, মায়া, মমতা ও
ভালোবাসার মূর্ত প্রতীক৷ পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাঁকে
রহমাতুলি্লল আলামিন বা বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবে উল্লেখ করেছেন
৷ ইসলামের ইতিহাস নিয়ে যারা গবেষণা করেছেন তারা রাসূলের মহান
চরিত্র এবং উন্নত আচরণকে বিশ্ববাসী ইসলামের বিকাশের অন্যতম প্রধান
কারণ বলে উল্লেখ করেছেন ৷ মহান আল্লাহও রাসূলের সুউচ্চ মর্যাদার
কথা তুলে ধরেছেন ৷ সুরা তওবার ১২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন,
"তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে রাসূল এসেছেন ৷ তোমাদের দুঃখ
কষ্ট তার জন্য দুঃসহ ৷ তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী এবং মুমীনদের প্রতি
স্নেহশীল, দয়াময় ৷"
রাসূলের উন্নত চরিত্রের কারণে শুধু মুসলমানরা ছাড়াও সকল যুগের
চিন্তাশীল ব্যক্তিরা বিশ্বনবীর ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করেছেন ৷
ফরাসী চিন্তাবিদ হায়দার বামাত ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ে বলেছেন,
পশ্চিমারা ইসলাম ধর্ম ও এর রাসূলের বিরুদ্ধে ঘৃন্য অপবাদ আরোপের
মাধ্যমে আসলে নিজেদেরকে কলুষিত করেছে ৷ যদি লক্ষ্যের মহত্ত্ব দিয়ে
কোন নেতার ব্যক্তিত্ব পরিমাপ করা হয়, তবে
নতুন ইতিহাসে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)এর চেয়ে মহামানব আর কে হতে পারে
?' ফরাসী কবি লা মার্টিন আরো সুন্দরভাবে
বলেছেন, ' বিশ্বের মহাপ্রতাপশালী ব্যক্তিরা
অস্ত্রের ভাষায় কথা বলেছে এবং ধর্মের অবমাননা ও দেশ দখল ছাড়া তাদের
আর কোন কাজ ছিলনা ৷ কিন্তু ইসলামের মহান নবী এক্ষেত্রে নতুন
চিন্তাধারা মানবীয় মূল্যবোধ সৃষ্টি করেন ৷ তিনি তার কিতাবের
শিক্ষার ভিত্তিতে মূর্তিপূজার বিরোধিতা, এক
সৃষ্টিকর্তার সাথে বন্ধুত্ব এবং সকল মানুষের প্রতি দয়া ও
সহমর্মীতার সম্পর্কের কথা ঘোষণা করেন ৷ ইউরোপীয় দেশগুলোতে রাসূলের
অবমাননার ফলে যে প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে তা হলো,
বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার সীমা কতটুকু?
ফ্রিল্যান্স রিপোর্টার্সদের সংস্থা এ সম্পর্কে এক
বিবৃতিতে জানিয়েছে, কার্টুন প্রকাশের এ
ঘটনা অন্ততপক্ষে আমাদেরকে এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে যে,
কী করে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান রেখে বাক
স্বাধীনতা রক্ষা করা যায় ৷'
১৯৭৬ সালে অনুমোদিত জাতিসংঘের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত
কনভেনশনে এ ধরনের অবমাননাকে অপরাধ বলে গণ্য করা হয়েছে৷ ঐ কনভেনশনের
দ্বিতীয় অধ্যায়ের ২০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে,
জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয়
ঘৃনাকে উস্কে দিয়ে বিদ্বেষ, শত্রুতা এবং
সহিংসতা সৃষ্টি করা আইনত নিষিদ্ধ৷'
জাতিসংঘের ঐ কনভেনশনের ভিত্তিতে ডেনমার্কসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের
যেসব পত্রিকায় রাসূলের অবমাননাকর কার্টুন ছাপা হয়েছে,
সেসব পত্রিকার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহন
করা উচিত৷ তবে পশ্চিমা দেশগুলোতে ইসলামের অবমাননার পূণরাবৃত্তি রোধ
করার জন্য আরো কঠোর ও স্পষ্ট আইন প্রণয়ন করা উচিত বলে অনেকে মনে
করছেন৷ এ ব্যাপারে ইসলামী সম্মেলন সংস্থা বা ওআইসি একটি জরুরী
অধিবেশনে বসার চেষ্টা করছে৷ ঐ বৈঠকে ইসলাম অবমাননার বিরুদ্ধে
জাতিসংঘের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করা হবে৷
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ
সাঃ এর অবমাননার মাধ্যমে বিশ্বের দেড়শ কোটি মুসলমানের অনুভূতিতে
আঘাত করা হয়েছে৷ ইসলামের দূ্যতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া রুখতেই এ
ঘৃন্য কাজ করা হয়েছে৷ যে রাসূলের প্রতি স্বয়ং আল্লাহ দুরুদ প্রেরণ
করেছেন, তার অবমাননার এক গর্হিত কাজ হয়তো
ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে৷ কিন্তু এসব অবমাননার ফলে দয়া ও
মহানুভবতার আধার বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর উন্নত চরিত্রের
ওপর বিন্দুমাত্র কলংক লেপন করা যাবেনা ৷ #