
বিশ্বনবী(সাঃ)'র
প্রতি অবমাননাঃ পাশ্চাত্যের নব্য জাহেলিয়াত
সমপ্রতি পাশ্চাত্যের আধুনিক বর্বরতাবাদী বিশেষ মহল মহান আল্লাহর
প্রেরিত সর্বশেষ নবী এবং মানবতার মুক্তিদূত ও সর্বকালের
সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হযরতম মুহাম্মাদ (সাঃ)কে অবমাননা
করার মতো ঔদ্ধত্যপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে ৷ পাশ্চাত্যের কথিত সভ্য
দেশগুলোতে এ ধরনের কুরুচিপূর্ণ নাটকের পুনরাবৃত্তিতে চিন্তাবিদগণ
ভাবছেন পাশ্চাত্য ও ইউরোপের নৈতিক অধপতনের মাত্রা কত নিম্নস্তরে
পৌঁছেছে! বিস্ময়ের ব্যাপার হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ এবং
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রীসহ ইউরোপ ও আমেরিকা তথা পাশ্চাত্যের
অধিকাংশ রাষ্ট্রপ্রধান এ নোংরা পদক্ষেপকে বাক স্বাধীনতার প্রকাশ
বলে দাবী করেছেন! মানবীয় বিবেক কতটা অকার্যর্কর,
অসুস্থ বা বিভ্রান্ত হলে তারা আধ্যাত্মিকতা ও
নৈতিকতাবিরোধী এমন অপকর্মকে বাকস্বাধীনতা বলে দাবী করতে পারেন তা
সত্যিই ভেবে দেখার বিষয়৷
ডেনমার্কের জিল্যান্ড পোস্টেন নামের একটি অখ্যাত পত্রিকায় বিশ্বনবী
(সাঃ)'র প্রতি অবমাননাকর ১২টি কার্টুন
ছাপানোর প্রতিবাদে মুসলমানদের বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ শুরু হলে নব্য
জাহেলিয়াতপন্থী ঐ মহল আরো বেশী ঔদ্ধত্য দেখাতে থাকে ৷ ডেনমার্কের
পর নরওয়ে, সুইডেন,
ফ্রান্স, জার্মানী এবং আরো কয়েকটি ইউরোপীয়
দেশের কিছু পত্র পত্রিকায় ঐ ১২টি কার্টুন ছাপানো হয় ৷ এই
পত্রিকাগুলো গোটা মানবজাতির জন্যে আল্লাহর রহমত বা অনুগ্রহ হিসেবে
প্রেরিত মহানবী (সাঃ)কে ব্যাঙ্গ করে আঁকা কার্টুনগুলো প্রকাশ করাকে
বাক স্বাধীনতা বলে অপব্যাখ্যা দেয়! এমনকি ডেনমার্কের ঐ পত্রিকাটি
দেড়শ কোটি মুসলমানের পবিত্র অনুভূতিতে আরো বেশী আঘাত দেয়ার
লক্ষ্যে- "মুহাম্মাদের কোন্ ছবি আপনাদের কাছে আছে?
তাকে হত্যা করুন ও পুরস্কার নিন"- শীর্ষক একটি
প্রতিযোগীতাও সম্পন্ন করে ৷
অবশ্য পাশ্চাত্যের দেশগুলোর দ্বিমুখি ও স্ববিরোধী নীতিগুলো
সম্পর্কে প্রায় সবাইই কম বেশী অবহিত৷ ইউরোপীয় জোটের খবর সংক্রান্ত
ওয়েব পেইজে এ খবর এসেছে যে গেরহার্ড হাদরার নামের একজন অস্ট্রিয়
কার্টুনিস্টকে হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে ব্যাঙ্গ চিত্র বা কার্টুন
আঁকা এবং খৃষ্টীয় জগতকে অবমাননার অপরাধে কারাদন্ড দেয়া হয়েছে ৷
ডেনমার্কেও একটি খ্যাতনামা কোম্পানীর স্যান্ডেলে হযরত ঈসা (আঃ) ও
মারিয়াম (সাঃ)'র ছবি ছাপানো হলে খৃষ্টান
সমাজের প্রতিবাদের মুখে ঐ কোম্পানী ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং
স্যান্ডেলগুলো বাজার থেকে তুলে নেয় ৷ এখন প্রশ্ন হলো এই একই ইউরোপে
বিশ্বনবী (সাঃ)'র প্রতি অবমাননা কি করে বাক
স্বাধীনতার অজুহাতে বৈধতা পেতে পারে?
পাশ্চাত্যের পত্র পত্রিকায় ইসলাম অবমাননার এ পদক্ষেপের সাথে
ইহুদিবাদি মহলের ষড়যন্ত্র যুক্ত বলে অনেকেই মনে করেন ৷
ইহুদিবাদীদের প্ররোচনায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের
অংশ হিসেবে এর আগেও সালমান রুশদি নামের একজন ধর্মত্যাগী মুসলমানকে
দিয়ে মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাসের অবমাননার জন্যে স্যাটানিক
ভার্সেস নামের একটি বই প্রকাশ করা হয়েছিল ৷ আসলে ইসলামের
পবিত্রতাকে ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ করা বা ইসলামের মহান ব্যক্তিত্বদের
অবমাননা করার মাধ্যমে ইসলাম বিদ্বেষী ইহুদিবাদী গোষ্ঠী খৃষ্টান
নামধারী পাশ্চাত্য ও ইউরোপের সরকারগুলোকে দিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে
সাংস্কৃতিক ক্রুসেড পরিচালনা করতে চাইছে৷ আর এভাবে তারা দেশে দেশে
এবং বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতে ইসলাম সম্পর্কে বিকৃত ধারণা
সৃষ্টি করতে চাচ্ছে যাতে এ পবিত্র ধর্ম সম্পর্কে পশ্চিমা জনগণের
মধ্যে ক্রমবর্ধমান আগ্রহ বা আকর্ষণ ঠেকিয়ে রাখা যায় ৷ কিন্তু
বাস্তবে এ ধরনের ইসলাম বিদ্বেষী পদক্ষেপের পর ইসলামের প্রতি
পাশ্চাত্যের বুদ্বিজীবী মহলসহ সাধারণ জনগণের আকর্ষণ আরো বৃদ্ধি
পেয়েছে ৷
২০০১সালের ১১ ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার পরও ইসলাম ও মুসলমানদেরকে
সন্ত্রাসের সহযোগী হিসেবে প্রচার করে পশ্চিমা সরকারগুলো মুসলমানদের
ওপর বিভিন্ন ধরনের হয়রানি ও চাপ বৃদ্ধি করেছে ৷ বাক স্বাধীনতা ও
ধর্মীয় স্বাধীনতার ধ্বজাধারী ইউরোপের একাধিক দেশে মুসলিম মহিলাদের
হিজাব বা ওড়না পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা ও সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে ৷
কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী এতসব পদক্ষেপের পরও পাশ্চাত্যে ইসলাম ধর্ম
দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে ৷ বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোয় তথাকথিত নারী
স্বাধীনতার নামে নারীদের পণ্য বা ভোগের সামগ্রীতে পরিণত করার নৈতিক
অধপতনের হাত থেকে মুক্তির প্রত্যাশি অমুসলিম মহিলারা ইসলামের
সুশীতল ছায়াতেই খুঁজে পাচ্ছেন জীবনের সার্বিক মুক্তি৷
ইসলামের নবী বা রাসূল (সাঃ)'র অবমাননার
সামপ্রতিক পদক্ষেপ নেয়ার মাধ্যমে ধর্ম ও নৈতিকতার বিরোধী বিশেষ
মহলটি যে উদ্দেশ্য হাসিল করতে চেয়েছিল তা অর্জিত হয় নি ৷
ইহুদিবাদীদের মাধ্যমে শৃঙ্খলিত পাশ্চাত্যের অধিকাংশ রাজনীতিবিদ
ইসলাম ধর্ম অবমাননার এ ষড়যন্ত্রে পরোক্ষভাবে শরীক হলেও সাধারণ
খৃষ্টান জনগণ ইহুদিবাদীদের পাতানো এ ফাঁদে পা দেয় নি ৷ তার প্রমাণ
হলো সমপ্রতি কানাডার অটোয়া শহরে মহানবী (সাঃ)'র
জীবনী পর্যালোচনার জন্যে আয়োজিত উন্মুক্ত এক অনুষ্ঠানে দেশটির অনেক
চিন্তাবিদসহ বিপুল সংখ্যক অমুসলিম ব্যাপক উত্সাহ ও উদ্দীপনাসহকারে
অংশ নিয়েছে ৷ এদিকে খোদ ডেনমার্কের গীর্যাগুলোর সদস্যরাও এক
বিবৃতিতে ইসলাম ধর্মের প্রতি তাদের বিশেষ শ্রদ্ধা থাকার কথা এবং
ধর্মীয় মহাপুরুষদের প্রতি অবমাননা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে
ঘোষণা করেছে ৷
বিশ্বনবী (সাঃ)'র প্রতি অবমাননার প্রতিবাদে
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা প্রতিবাদ মিছিল বের করায় মার্কিন
প্রেসিডেন্ট বুশসহ ইউরোপের আরো কয়েকজন কর্মকর্তা একে ইসলামী
সহিংসতা বা বাক স্বাধীনতার প্রতি মুসলমানদের অসহিষ্ণুতা বলে
দেখানোর চেষ্টা করেছেন ৷
তাদের ভাবখানা এমন যে ইসলামের নবীর প্রতি অবমাননা করা হলেও তা নিয়ে
মুসলমানদের ক্ষোভ প্রকাশ করা উচিত নয় ৷ এ প্রসঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ
নেতা হযরত আয়াতুল্লাহ উজমা খামেনী বলেছেন,
মুসলমানরা তাদের নবী (সাঃ)'র প্রতি
অবমাননার বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ জানাচ্ছে তা যথাযথ এবং সময় উপযোগী ৷
পাশ্চাত্যের জনগণের বোঝা উচিত মুসলমানরা এসব প্রতিবাদের মাধ্যমে
খৃষ্টান বা ইহুদিদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে না ৷ বরং একটি
বিশেষ কূচক্রী মহলের নোংরা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেই তারা প্রতিবাদ
জানাচ্ছে যারা খোদায়ী ধর্মগুলোর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে বিপন্ন
করে ধর্মগুলোর মধ্যে সংঘাত সৃষ্টির মাধ্যমে নিজের অশুভ লক্ষ্যগুলো
বাস্তবায়ন করতে চায় ৷ ইসলামী ইরানের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ
আহমাদিনেজাদও বলেছেন, যারা বিশ্বনবী (সাঃ)'র
অবমাননা করছে তারা খৃষ্টানও নয়, ইহুদিও নয়
বরং তারা সব ধর্মেরই শত্রু ৷ তাঁরা মানব জাতিকে বিশ্বনবী
(সাঃ) ও অন্যন্য নবীগণের দেয়া পথ নির্দেশনার কল্যাণ থেকে বঞ্চিত
রাখতে চায় বলেও তিনি মন্তব্য করেন ৷
প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ গত ১১ ই ফেব্রুয়ারীতে দেয়া এক ভাষণে আরো
বলেছেন, যারা বিভিন্ন ধরনের পীড়াপীড়ির
মাধ্যমে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর অবমাননা করতে চায় তারা
ভুলের সাগরে নিমজ্জিত ৷ কারণ , সূর্য সবসময়
জ্বলজ্বলে, এর উপর কলংকের ছাপ ফেলা
দুঃসাধ্য ব্যাপার ৷ অতএব নবীজীকে অপমানিত করার বৃথা চেষ্টা করো না
৷ যারা সূর্যের দিকে ধুলোমাটি নিক্ষেপ করে তারা নিজেরাই অন্ধ হয়ে
যাবে ৷
ইরানের প্রেসিডেন্ট এ প্রসঙ্গে আরো বলেছেন,
আমরা যখন রাসূলের অবমাননার প্রতিবাদ জানাই তখন ওরা বলে,
তাদের দেশে বাক স্বাধীনতা রয়েছে ৷ ওরা বাক
স্বাধীনতার ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলছে ৷ আসলে ওরা ইহুদীবাদীদের হাতে
পণবন্দী হয়ে পড়েছে৷ এই পনবন্দীদের জন্যে ইউরোপ ও আমেরিকার জনগণকেই
মূল্য দিতে হচ্ছে৷ জনাব আহমাদিনেজাদ প্রশ্ন করেন,
তোমাদের দেশে যখন হোলোকাস্টের ব্যাপারে গবেষণা করা
নিষিদ্ধ, তখন কী করে সেখানে রাসূলের
অবমাননা করার স্বাধীনতা থাকে? এই
হলোকাস্টের কথা বলে ইহুদিবাদীরা গত ষাট বছর ধরে অন্যান্য দেশের
সাথে বলদর্পী আচরণ করছে এবং মজলুম ফিলিস্তিনীদের হত্যা করছে ৷
এবারে বিশ্বনবী (সাঃ) সম্পর্কে দু জন অমুসলিম মনীষীর বক্তব্য শোনা
যাক ৷
ইংরেজ লেখক জন ডেভেনপোর্ট "মুহাম্মাদের জন্যে একটি কৈফিয়ত"
শীর্ষক গ্রন্থে লিখেছেন, নবী মুহাম্মাদের
মধ্যে ছিল সব ধরনের জনগণকে আকৃষ্ট করার এক চৌম্বকীয় শক্তি৷ তাঁর
নির্ভুল আচার আচরণ, সত্যবাদীতা,
সততা ও আমানতদারী, ন্যায়
বিচারের জ্ঞান প্রভৃতি গুণের মাধ্যমে তিনি আরব উপত্যকাকে বিপুল
সংখ্যক মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলেন ৷ তিনি কখনও ধনী ও
গরীবের মধ্যে প্রার্থক্য করতেন না৷ পবিত্র ইসলাম ধর্ম তাঁর
অনুসারীদের মধ্যে সব ধরনের মানবীয় গুণাবলী গড়ে তুলেছে৷ এ ধর্ম
যথাসময়ে এমন এক মহান সভ্যতার জন্ম দিয়েছে যা গভীরভাবে বিভিন্ন
জাতিকে প্রভাবিত করেছে এবং দেখিয়েছে অন্ধকারের অমানিশায় হিরন্ময়
মুক্তির উজ্জ্বল আলোকচ্ছটা ৷
অধ্যাপক লামার্টাইন ফরাসী ভাষায় লিখিত তাঁর হিস্টোরি দ্যা টারকুইজ
গ্রন্থে বিশ্বনবী (সাঃ)'র মর্যাদা ও
শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে লিখেছেন, পৃথিবীতে
কখনোই কোনো মানুষ মুহাম্মাদ (সাঃ)'র মতো
এতো উচ্চ মানের এবং এতো দীর্ঘস্থায়ী বিপ্লব সংঘটিত করতে পারেন নি৷
উদ্দেশ্যের ব্যাপকতা, মাধ্যমের ক্ষুদ্রতা
এবং বিস্ময়ে অভিভূত করে দেয়ার মতো প্রভাবকে যদি মানবীয় প্রতিভার
মানদন্ড হিসেবে ধরা হয় তাহলে বিশ্ব ইতিহাসের কোনো মহান ব্যক্তিকে
মুহাম্মাদ (সাঃ)'র সাথে তুলনা করার সাহস কি
কারো আছে ?
বিশ্বনবী (সাঃ) সম্পর্কে অমুসলিম মনিষীদের এসব বাণী থেকে বোঝা যায়,
তিনি ছিলেন গোটা বিশ্বের জন্যে মহান আল্লাহর রহমত
৷ যাঁরা এরকম একজন ধর্মনেতার অবমাননা করে তারা যেন সব ধর্মেরই
অবমাননা করলো এবং তারা গোটা মানবতারই অবমাননা করলো ৷ এ ধরনের
অবমাননাকারীরা সূর্যের দিকে মাটি নিক্ষেপকারীদের মতোই অন্ধকারের
জীব ও অন্ধকার যুগের মন মানসিকতাসম্পন্ন ৷
#