তেহরানে বিভিন্ন ঐশী ধর্মের আন্তঃসংলাপ

কিছুদিন আগে ডেনমার্কের একটি পত্রিকায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)'র প্রতি অবমাননাকর কয়েকটি কার্টুন প্রকাশিত হয়েছে ৷ এরপর ইউরোপের আরো কয়েকটি পত্রিকা ঐ একই কার্টুন ছাপিয়ে বিশ্বের দেড়শ কোটি মুসলমানদের পবিত্র অনুভূতিকে আহত করে ৷ এরই প্রেক্ষাপটে সমপ্রতি ইরানের ইসলামী সংস্কৃতি ও দিকনির্দেশনা সংস্থার উদ্যোগে তেহরানে বিভিন্ন ঐশী ধর্মের আন্তঃসংলাপ অনুষ্ঠিত হয় ৷ একদিনের এ সম্মেলনে ভ্যাটিকেন ও অর্থডক্স গীর্যাসহ মধ্যপ্রাচ্যের খৃষ্টানদের প্রতিনিধি, আমেরিকা ও বৃটেনের ইহুদিদের প্রতিনিধি, ইরানের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং ইরানের বিভিন্ন গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন ৷ এ সম্মেলনে ধর্মগুলোর পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং হযরত মুহাম্মদ(সাঃ)'র প্রতি অবমাননাকর পদক্ষেপগুলোর লক্ষ্য সম্পর্কে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করা হয় ৷
ইরানের ইসলামী সংস্কৃতি ও দিক নির্দেশনা সংস্থার প্রধান হুজ্জাতুল ইসলাম আরাকীর মতে
এই সেমিনার বা সম্মেলন অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় পবিত্রতার প্রতি অবমাননা বন্ধ করার ব্যাপারে ধর্মগুলোর প্রতিনিধি বা শীর্ষ কর্মকর্তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা ৷ তিনি বলেছেন
, রাসূল (সাঃ)'র প্রতি অবমাননা এবং ইরাকের ধর্মীয় পবিত্র স্থাপনা ধ্বংস করার উদ্দেশ্য হলো ধর্মগুলোর মধ্যে বিভেদ বা দুরত্ব সৃষ্টি করা ৷ তিনি বলেন, এ ধরনের অবমাননা বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি হুমকি এবং এ ধরনের পদক্ষেপ ধর্মগুলোর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে ৷ তিনি বলেন, ধর্মগুলোর মূল বিষয় বা কাজ হলো আহ্বান করা বা প্রচার করা ৷ তিনি যে কোনো ধরনের ধর্ম বিরোধী তত্‍পরতাকে পশ্চিমা সংস্কৃতির ফসল বলে বর্ণনা করেন ৷ ডেনমার্কসহ পাশ্চাত্যের অধিকাংশ দেশে ইসলামের মতো মহান ও বৃহত্‍ ধর্মগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত নয় ৷ এই দেশগুলোতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ৷ সুইজারল্যান্ডে মুসলমানরা মসজিদ বা প্রার্থনাকক্ষ এবং এমনকি কবরস্থানের জন্য জমিও পাবার অধিকার পাচ্ছে না, কারণ এ দেশটিতে ইসলাম রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত ধর্ম নয় ৷
ইরানের সংসদ স্পীকার হাদ্দাদ আদেল এ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুসলমানদের পবিত্রতার প্রতি অবমাননার নিন্দা জানিয়ে বলেন
, ইসলামের অবমাননা করে কার্টুন ছাপানোর ফলে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতি হয়েছে তা হলো, ধর্ম ও বাকস্বাধীনতাকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়া হচ্ছে ৷ তিনি বলেন, "ইরানের ইতিহাসে কখনও ধর্মের নামে গণহত্যা বা বংশনিধনযজ্ঞ চালানো হয় নি ৷ ইসলামের অনুসারীরা নিজ ধর্মের নীতিমালা বা বিশ্বাসের প্রতি অবিচল হলেও ইসলাম ধর্ম বা পবিত্র কোরআন কখনও অন্য ধর্মের অনুসারীদের সাথে খারাপ আচরণের অনুমতি দেয় না ৷ প্রকৃতপক্ষে ইসলাম অন্য ধর্মের অনুসারীদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের শিক্ষা দেয় ৷" হাদ্দাদ আদেল আরো বলেন, "পাশ্চাত্যের পত্র পত্রিকাগুলো এইসব কার্টুন বা ব্যাঙ্গচিত্র প্রকাশের মধ্য দিয়ে সভ্যতা ও শিষ্ঠাচারের কোনো একটি দিকও রক্ষা করে নি ৷ ইউরোপের সমস্যা হলো তারা বক্তব্য প্রকাশকে একটি কাজ বলে মনে করে না ৷ মুখের ভাষা ও কলমের ভাষা কি মানুষের অভিন্ন আচরণ থেকে উদ্ভুত নয় ?"
ধর্মগুলোর আন্তঃসংলাপের এ সম্মেলনে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা নানা ধর্মের প্রতিনিধিদের বক্তব্যে যে অভিন্ন দিকটি ফুটে উঠেছে তা হলো
, ঐশী ধর্মগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা ৷ আর্মেনীয় খৃষ্টান সমপ্রদায়ের প্রতিনিধি তেহরানের এ সম্মেলনে বলেন, সব ধর্মের পবিত্রতার প্রতি সম্মান জানানো উচিত ৷ শুধু ইসলাম ধর্মের অবমাননার ক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য ধর্মের প্রতি অবমাননারও প্রতিবাদ জানানো উচিত৷ আর সবারই উচিত এ নীতিতে বিশ্বাস করা ৷
ইরানের জাতীয় সংসদের জরাথ্রুস্ট ধর্মের প্রতিনিধি কুরুশ নিকনাম ধর্মীয় মহান ব্যক্তিত্বদের অবমাননায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন
, ইরানের সবচেয়ে প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ আবেস্তায় প্রত্যেক মানুষকেই শ্রদ্ধা করতে বলা হয়েছে, কারণ প্রত্যেক মানুষেরই বিবেক রয়েছে এবং মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব ৷ প্রত্যেক জাতির কাছেই নবী বা ঐশী মহাপুরুষ এসেছেন৷ তারা মানুষকে সচেতন করতে এবং সুপথ দেখাতে এসেছিলেন৷ আজ আমরা নবীগণের প্রতি অবমাননাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করতে প্রস্তুত বলেই এখানে এসেছি এবং আমরা বলতে চাই সব ধর্মই মানুষকে আল্লাহ বা খোদার দিকে আহ্বান জানাতে চায়৷ তেহরানে অনুষ্ঠিত ঐশী ধর্মগুলোর আন্তঃসংলাপে ইহুদিবাদ বিরোধী ইহুদিদের একটি সংস্থার অংশগ্রহণ ছিল এ সম্মেলনের একটি বিশেষ আকর্ষণ ৷ এ সম্মেলনে মার্কিন ইহুদিদের এই সংস্থার পক্ষ থেকে একটি ইশতেহার প্রকাশ করা হয় ৷ এতে বলা হয়েছে, ইহুদি ধর্ম এবং ইহুদিবাদ সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক বা বিপরীত, অন্য কথায় ইহুদিবাদের সাথে ইহুদি ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই ৷ এই ইশতেহারে ইহুদিবাদের প্রতিষ্ঠাতা থিওডোর হার্টজেলকে একজন অবিশ্বাসী ইহুদি ও ইহুদি ধর্মের অনুশাসন অমান্যকারী বলে উল্লেখ করা হয়েছে৷ এই বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ইহুদিবাদের সুচনালগ্নেই সারা বিশ্বের বিশ্বাসী ইহুদিরা বর্ণবাদী এ মতবাদ তথা ইহুদিবাদের নিন্দা জানিয়েছিল ৷ এই ইশতেহারে ইহুদিবাদীদের বিশ্বাসঘাতকতার ব্যাপারে পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমগুলোর নীরবতা ভেঙ্গে এ ব্যাপারে অজ্ঞতার অমানিশা দুর করে সত্যের আলো ফুটিয়ে তোলার আহ্বান জানানো হয় ৷
আমেরিকার ইহুদিবাদ বিরোধী ইহুদিদের অন্যতম নেতা ধর্মগুরু অহরোন কোহেন ইহুদিবাদী ইসরাইলকে ইহুদি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ইহুদিবাদী ইসরাইলকে
শান্তিপূর্ণ পন্থায় নির্মূল করার দাবী জানান৷ তিনি জানান
, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের ভিত্তিতে ইহুদিবাদী মতবাদ গড়ে উঠেছে এবং ইহুদিবাদীরা মহান স্রষ্টার ইচ্ছার বিরোধী তত্‍পরতা চালিয়ে যাচ্ছে৷ তিনি বলেন, স্রষ্টার ইচ্ছে হলো আমরা ইহুদিরা যেন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকি, কিন্তু ইহুদিবাদীরা ফিলিস্তিনে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে খোদায়ী বিধান লংঘন করেছে৷
ইহুদিবাদ বিরোধী ইহুদি আন্দোলনের অন্যতম নেতা অহরম কোহেন আরো বলেন
, পাশ্চাত্য সব সময় এ প্রচারণা চালায় যে, ইরানে ইহুদিদের সাথে খারাপ আচরণ করা হয় এবং ইরানের ইহুদিদেরকে রক্ষার উপায় বের করার জন্যে আমাদেরকে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়, অথচ গত কয়দিন ইরান সফর করে আমরা বুঝতে পেরেছি যে, ইরানের ইহুদিরা তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন ও জীবন যাপনের ক্ষেত্রে স্বাধীন এবং ইহুদিদের সাথে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের আচরণ খুবই ভালো৷
তেহরানে ঐশী ধর্মগুলোর আন্তঃসংলাপের অবকাশে ইহুদি পুরোহিত ডেভিড কোল্টম্যান জানান
, ইহুদিবাদী ইসরাইলী শাসকগোষ্ঠী কুসংস্কারাচ্ছন্ন, হিংস্র এবং ধর্মবিদ্বেষী৷ ইসরাইলের শাসনতন্ত্রে স্রষ্টার নামটি পর্যন্ত নেয়া হয়নি বলে তিনি জানান৷ তিনি বলেন, আমাদের দৃষ্টিতে মানুষের বিশ্বাস ও জীবনকে শ্রদ্ধা করতে হবে এবং অন্যদের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে জীবন যাপন করতে হবে৷ বর্তমানে ফিলিস্তিনিরা নিপীড়িত হচ্ছে, তাদের এ অবস্থায় আমরাও কষ্ট পাচ্ছি৷ ঐশী ধর্মগুলোর
আন্তঃসংলাপের এ মহতি সম্মেলন শেষ হয় ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাইয়েদ মুহাম্মদ খাতামীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে৷ তিনি মুসলমানদের পবিত্রতার প্রতি অবমাননার নিন্দা জানিয়ে বলেন
, স্বাধীনতা একটি পবিত্র বিষয় যা মানুষের অস্তিত্বের আলোকে পবিত্র৷ যদি আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় স্বাধীনতা না থাকে এবং যে বিশ্বে ধর্মীয় পবিত্রতার স্থান নেই সেখানে যতই স্বাধীনতার শ্লোগান দেয়া হোক না কেন তা প্রকৃত স্বাধীনতা নয়৷ বরং তা হবে আগ্রাসন চালানোর ও মুনাফা অর্জনের স্বাধীনতা মাত্র৷ আর এ অবস্থায় দমন-পীড়ন, যুদ্ধ, হত্যাযজ্ঞ ও দখলদারিত্ব বৈধ বলে স্বীকৃত হবে৷ তিনি ইসলামের পবিত্রতার প্রতি অবমাননা সম্পর্কে বলেন, এ ধরনের অবমাননা একটি তত্‍পরতা বা কাজ, এটা কোনো চিন্তা বা মতবাদ নয়, তাই একে বাক-স্বাধীনতা বলা যাবে না৷ অন্যদিকে এ ধরনের অবমাননা ইসলাম সম্পর্কে ভয়ভীতি ছড়ানোর বিষয়টিকে আরো শক্তিশালী করবে৷ এ সম্মেলনের শেষে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাইয়েদ মুহাম্মদ খাতামী আল্লাহর নবীগণের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে একটি চারা গাছ রোপন করেন৷ এ সময় তিনি এ কবিতাটি আবৃত্তি করেনঃ


বন্ধুত্বের বৃক্ষ করো রোপণ
এতে মানুষের মনোবাসনা হবে পূরণ ৷
শত্রুতার চারাগাছ করো নির্মূল
যা প্রজ্জ্বলিত করে অশেষ অশান্তির অনল ৷

ঐশী ধর্মগুলোর আঞ্চলিক পরিষদের এ আন্তঃসংলাপ ছিল এই পরিষদের দ্বিতীয় বৈঠক ৷ এর সমাপনী ইশতেহারে বলা হয়েছে
, খোদায়ী ধর্মগুলোর প্রতিনিধি, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব এবং অন্যান্য কর্মকর্তা সংলাপের নীতিকে বিভিন্ন ঐশী ধর্মের অনুসারীদের পারস্পরিক সমঝোতা, পরিচিতি এবং সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ব ও বিশ্বাসগত সম্পর্ক জোরদারের জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পন্থা বলে মনে করেন৷ এ ইশতেহারে পারস্পরিক সম্মানকে ধর্মগুলোর আন্তঃসংলাপ অব্যাহত রাখার প্রধান শর্ত বলে উল্লেখ করা হয়৷ এ ছাড়াও এ ইশতেহারে ধর্মগুলোর মূল্যবোধ, পবিত্রতা, ধর্মনেতা ও ধর্মীয় স্থাপনা রক্ষা করাকে সবার জরুরী দায়িত্ব বলে উল্লেখ করা হয়েছে৷ একইসাথে এ ইশতেহারে সংস্কৃতি ও ধর্মগুলোর মধ্যে বিভেদ ও হিংসা ছড়িয়ে দেয়ার চক্রান্তগুলোকে সহিষ্ণুতা ও সচেতনতার মাধ্যমে প্রতিরোধের আহ্বান এবং ঐশী ধর্মগুলোর পক্ষ থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে ধর্মীয় পবিত্রতার প্রতি যে কোনো অবমাননার তীব্র নিন্দা জানানো হয় ৷

 
( রেডিও তেহরান থেকে ২০/২/০৬ তারিখে প্রচারিত )
#