কোরআনের আলো
(১২১ তম পর্ব )

সুপ্রিয় পাঠক, কোরআনের আলোর আজকের পর্বে আমরা সুরা নিসার ৩৪ নম্বর আয়াত থেকে আলোচনা শুরু করবো ৷ প্রথমে এই আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করা যাক ৷ 'পুরুষেরা নারীদের অভিভাবক বা কর্তা ৷ কারণ, আল্লাহ তাদের একের উপর অপরকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং পুরুষেরা নিজের ধন-সম্পদ থেকে ব্যয় করে ৷ সতী-সাধবী স্ত্রীরা অনুগত এবং বিনম্র ৷ স্বামীর অনুপস্থিতিতে তারা তাঁর অধিকার ও গোপন বিষয় রক্ষা করে ৷ আল্লাহই গোপনীয় বিষয় গোপন রাখেন৷ যদি স্ত্রীদের অবাধ্যতার আশংকা কর তবে প্রথমে তাদের সত্‍ উপদেশ দাও ৷ এরপর তাদের শয্যা থেকে পৃথক কর এবং তারপরও অনুগত না হলে তাদেরকে শাসন কর ৷ এরপর যদি তারা তোমাদের অনুগত হয়, তবে তাদের সাথে কর্কশ আচরণ করো না৷ নিশ্চয়ই আল্লাহ সমু্ন্নত-মহীয়ান৷' পবিত্র কোরআনের এই আয়াতে স্বামী ও স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে ৷ কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, পবিত্র কোরআনের পারিবারিক বিষয় সম্পর্কিত অনেক আয়াতের মত অজ্ঞ লোকদের মাধ্যমে এই আয়াতেরও অপব্যবহার বা অপব্যাখ্যার সুযোগে ইসলাম ধর্ম ও পবিত্র কোরআন সম্পর্কে প্রশ্ন সৃষ্টি করছে এবং এসব নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করছে৷ অজ্ঞ ও অসুস্থ শ্রেণীর একদল পুরুষ এ আয়াতের ভিত্তিতে নিজেদেরকে মালিক এবং স্ত্রীদেরকে বাদী বা দাসী বলে মনে করে ৷ তাদের মতে, স্ত্রীদেরকে অন্ধের মত স্বামীর যে কোন নির্দেশ মানতে হবে এবং স্ত্রীদের সিদ্ধান্ত নেয়ার বা মত প্রকাশের কোন অধিকার নেই ৷ এইসব পুরুষদের ভাবখানা এমন যে, তাদের যে কোন নির্দেশ যেন খোদারই নির্দেশ এবং স্ত্রীরা তাদের নির্দেশ অমান্য করলেই তাদেরকে কঠোর শাস্তি দিতে হবে৷ এই বিভ্রান্তির কারণ হলো আয়াতের প্রকৃত অর্থকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী অর্থ করা ৷ এই আয়াতের প্রকৃত অর্থ হলো, আয়াতের প্রথম অংশে পুরুষদেরকে পরিবারের ও স্ত্রীদের সব বিষয়ের তত্ত্বাবধায়ক বা অভিভাবক বলা হয়েছে ৷ আধুনিক সমাজ-বিজ্ঞানে পরিবারকে বৃহত্তর সমাজের প্রথম ও প্রধান একক বলে গুরুত্ব দেয়া হয় ৷ একজন পুরুষের সাথে একজন নারীর বিয়ের মাধ্যমেই এই পরিবার গঠিত হয় এবং সন্তান সন্তুতি জন্মের ফলে পরিবারের আয়তন বৃদ্ধি পায় ৷ স্বাভাবিকভাবেই পরিবার নামের এই ছোট্ট সমাজের বিভিন্ন দিক পরিচালনার জন্যে একজন পরিচালক থাকা দরকার ৷ তা-না হলে পরিবারে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য দেখা দিবে ৷ একদল ছাত্র যদি কোথাও থাকে, তাহলে সেখানেও ছাত্রদের মধ্যে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য তাদের মধ্য থেকে অধিনায়কসহ বিভিন্ন বিষয়ের দায়িত্ব পালনের জন্য অন্যান্য প্রতিনিধিও নিয়োগ করা হয় ৷
তাই এটা স্পষ্ট, পরিবারের জন্য একজন পরিচালক বা নেতা থাকা অপরিহার্য ৷ সন্তানরা পরিবার ও নিজ বাবা মায়ের পরিচালক হতে পারেনা এটা খুবই স্পষ্ট৷ পরিত্র কোরআন নারী ও পুরুষ তথা স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে স্বামীকে দুটি কারণে পরিবারের পরিচালক বলে উল্লেখ করেছে৷ প্রথমত ঃ পুরুষরা মহিলাদের চেয়ে শারীরিক দিক থেকে বেশী শক্তিশালী৷ আর তাই পুরুষদের আয় উপার্জন ও পরিশ্রমের ক্ষমতা বেশী৷ আর দ্বিতীয় যুক্তি হলো, জীবন যাপনের সমস্ত খরচ যেমন- খাদ্য,বাসস্থান,,পোশাক ও জীবন যাপনের অন্যান্য সব খরচ যোগানোর দায়িত্ব স্বামীর৷ অন্যদিকে ইসলামের দৃষ্টিতে নিজের ও সংসারের কোন ধরনের খরচ যোগানোর সামান্য বাধ্যবাধকতাও স্ত্রীর নেই এমনকি তাঁর নিজস্ব আয় উপার্জন থাকলেও তা খরচ করা তার জন্য জরুরী নয়৷ অন্যকথায় ইসলাম পরিবারের কল্যাণ ও সুখ সমৃদ্ধি কঠিন দায়িত্ব পুরুষের ওপর অর্পন করেছে৷ আর এই দায়িত্ব পালনের জন্য পরিবার বিষয়ের সমস্ত ক্ষমতা পুরুষের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে৷ পুরুষরা এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হলেও স্ত্রীদের ওপর বলদর্পী বা কতর্ৃত্বকামী হবার কোন অধিকার তাদের নেই৷ পরিবার পরিচালনার ক্ষেত্রেই পুরুষের দায়িত্ব সীমিত৷ নিজের কোন কাজে স্ত্রীকে দাসী হিসেবে ব্যবহার করা বা স্ত্রীর ওপর জুলুম করার কোন অধিকার পুরুষের নেই৷ পুরুষ বা স্বামী যখন কোন অন্যায় করে বা স্ত্রীর ভরণ পোষণের খরচ দিতে অস্বীকার করে কিংবা স্ত্রী ও সন্তান সন্ততির জীবন দূর্বিষহ করে তোলে তাহলে স্ত্রীর অনুরোধে বিচারক বা কাজী এক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে পারে৷ এমনকি প্রয়োজন হলে পুরুষ বা স্বামীকে তার অঙ্গীকার পূরণে বাধ্য করতে পারে৷ সামগ্রীকভাবে এটা মনে রাখতে হবে যে, পারিবারিক পরিবেশে পুরুষের পরিচালনার অর্থ কোনক্রমেই স্ত্রীর ওপর পুরুষের কতর্ৃত্ব নয়৷ নারী ও পুরুষ তথা মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হলো খোদাভীতি ও ঈমান৷ আয়াতের দ্বিতীয় অংশে দুই ধরনের স্ত্রীর কথা বলা হয়েছে৷ সতী স্ত্রীরা পারিবারিক ব্যবস্থার প্রতি অঙ্গীকার বদ্ধ৷ তারা শুধু স্বামীদের উপস্থিতিতেই নয়, তাদের অনুপস্থিতিতেও স্বামীর ব্যক্তিত্ব, গোপনীয়তা ও অধিকার রক্ষা করে৷ এই শ্রেণীর স্ত্রীরা প্রশংসা পাবার যোগ্য৷ অন্য এক শ্রেণীর স্ত্রী দাম্পত্য জীবনে স্বামীর অনুগত নয় ৷ এ ক্ষেত্রেই আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, 'স্ত্রীর অবাধ্যতার আশংকা থাকলে তাদেরকে উপদেশ দাও ও সতর্ক কর ৷' যদি উপদেশ দেয়া ও সতর্ক করার পরও কাজ না হয় তাহলে স্বামী তার উপর রাগ করে কিছুকাল দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীকে উপেক্ষা করতে পারে এবং এভাবে তার উপর নিজের ক্ষোভ বা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতে পারে ৷ যদি এরপরও স্ত্রী দাম্পত্য জীবনের দায়িত্ব পালনে বিরত হয় এবং কিছুটা কঠোর হওয়া ছাড়া অন্যকোন পথ বাকী না থাকে তাহলে স্ত্রীকে শারীরিকভাবে শাসন করার অনুমতি স্বামীকে দেয়া হয়েছে ৷ অবশ্য হালকা ও মোলায়েম শাসন স্ত্রীকে তার ভুল ধরিয়ে দিতে পারে ৷ স্ত্রীর অবাধ্যতার মাত্রা অনুযায়ী যে তিন পর্যায়ের ব্যবস্থার কথা পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে তা স্ত্রীর সাথে স্বামীর সম্ভোগ সম্পর্কিত ৷ অনেক সময় স্ত্রীরা কথাবার্তার মাধ্যমে স্বামীর অবাধ্য হয় ৷ এক্ষেত্রে মৌখিক উপদেশই যথেষ্ট ৷ কখনো কখনো স্ত্রীরা কাজ কর্মের মাধ্যমে স্বামীর অবাধ্য হয় ৷ এক্ষেত্রে কাজের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং স্ত্রীর শয্যা থেকে দূরে থাকতে হবে ৷ কিন্তু অনেক সময় স্ত্রীর অবাধ্যতার মাত্রা হয় অত্যন্ত কঠোর ৷ এ অবস্থায় শারীরিকভাবে তাকে শাসন করা উচিত ৷ একইভাবে স্বামী যদি তার দায়িত্ব পালনে বিমূখ হয় তাহলে বিচারকের মাধ্যমে তার বিচার এবং প্রয়োজনে শারীরিকভাবেও তাকে শাসন করতে হবে ৷ কারণ স্ত্রীর ভরণ-পোষণ করা স্বামীর দায়িত্ব সত্ত্বেও তা থেকে বিমূখ হওয়া স্ত্রীর অধিকারের লঙ্ঘন এবং তাই বিয়ের চুক্তির লঙ্ঘনের দায়ে আদালতে স্বামীর বিচার হতে পারে ৷ কিন্তু স্বামী স্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পারিবারিক ও গোপনীয় হওয়ায় ইসলাম এ ধরনের সমস্যা পরিবারের মধ্যেই মিটিয়ে ফেলাকেই প্রাধান্য দেয় ৷ পুরুষ যেখানে তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে বাদী সেখানে স্ত্রীকে শারীরিকভাবে শাসন করার ক্ষমতা থাকার কারণে তা প্রয়োগ করা হলে পরিবারের সম্মান ক্ষুন্ন হবে ৷ উল্লেখ্য আগেই বলা হয়েছে, এই শাসন হতে হবে অবশ্যই মোলায়েম , কঠোর বা প্রতিশোধ মূলক না ৷ ইসলামের এই বিধানের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ইসলাম বিভিন্ন পর্যায়ে অত্যন্ত সুক্ষ্ম পন্থায় পরিবার ব্যবস্থাকে ক্ষতি ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার ব্যবস্থা নিয়েছে ৷ এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো, প্রথমত : দুই ব্যক্তির একটি সমাজেও অবশ্যই একটি নেতা বা পরিচালক নির্বাচন করা উচিত ৷ যিনি জীবন যাবনের খরচ যোগানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবারের পরিচালনায় তারই অগ্রাধিকার রয়েছে ৷ দ্বিতীয়ত : স্বামীর আনুগত্য করা দূর্বলতার লক্ষণ নয় বরং পরিবারের প্রতি সম্মান ও পরিবার টিকিয়ে রাখার জন্যই তা জরুরী ৷ তৃতীয়ত : শুধু নামায রোজাই সত্‍ কাজ নয় পরিবারের অধিকার রক্ষা এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালনও সত্‍কাজের অন্তর্ভূক্ত ৷ চতুর্থত : স্ত্রীর ভুল বা অপরাধের ব্যাপারে অজুহাত প্রবণ বা প্রতিহিংসা পরায়ণ হওয়া উচিত নয়৷ তাঁর কল্যাণ ও সংশোধনের ইচ্ছাকেই এ ক্ষেত্রে আচরণের মাপকাঠি করতে হবে৷ পঞ্চমত : পুরুষদের এটা মনে রাখতে হবে, পরিবার পরিচালনার দায়িত্ব৷ তাদের ওপর অর্পণ করা হলেও আল্লাহ তাদের আচরণ ও তত্‍পরতা লক্ষ্য করছেন এবং স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে আচরণের ব্যাপারে কিয়ামতের দিন জবাবদিহি করতে হবে ৷ #

 কোরআনের আলো

  ( ১২২ তম পর্ব )

সুপ্রিয় পাঠক , কোরআনের আলোর আজকের পর্বে আমরা সুরা নিসার ৩৫ নম্বর আয়াত থেকে আলোচনা শুরু করবো ৷ প্রথমে এই আয়াতের তেলাওয়াত ও তরজমা শোনা যাক ৷ 'যদি তোমরা উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা কর, তবে তার বংশ থেকে একজন সালিশ নিয়োগ কর ৷ যদি তারা মীমাংসা কামনা করে, তবে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করবেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ এবং সবার মনের কথা জানেন ৷' এই আয়াতে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে মতভেদ দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য পারিবারিক আদালত গঠনের প্রস্তাব দিয়ে বলা হচ্ছে, যদি স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বিবাদ চরমে পেঁৗছে , তাহলে উভয় পক্ষের পরিবারকে এই দ্বন্দ্ব মিটিয়ে ফেলার উদ্যোগ নিতে হবে ৷ বিবাদ যেন তালাক পর্যন্ত না গড়ায় সেজন্য তাদেরকে সক্রিয় থাকতে হবে এবং স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের অধিকার রক্ষার জন্য উভয় পক্ষের পরিবার থেকে একজন করে সালিশ বা মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করতে হবে৷ সালিশদের কাজ হলো স্বামী ও স্ত্রীর আচরণ সংশোধনের লক্ষ্যে তাদের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টি করা ৷ সমঝোতা প্রতিষ্ঠাই তাদের কাজ ৷ কারো বিচার করে শাস্তি দেয়া তাদের কাজ নয় ৷ ইসলামী এই প্রথার বিশেষ কিছু সুবিধে রয়েছে ৷ প্রথমত : এরফলে পারিবারিক সমস্যার কথা দুই পরিবারের কেউ জানতে পারে না এবং এতে করে পরিবারের মর্যাদা অক্ষুন্ন থাকে৷ দ্বিতীয়ত : মধ্যস্থতাকারীরা সংশ্লিষ্ট পরিবারের মধ্য থেকে নির্বাচিত হওয়ায় পারিবারিক সমস্যা সমাধানের জন্য তারা আন্তরিক হয়ে থাকেন ৷
তৃতীয়ত : মধ্যস্থতাকারীরা উভয়পক্ষের মাধ্যমে মনোনীত হন বলে দু'পক্ষের পরিবারই তাদের রায় মেনে নেয় ৷ কিন্তু বর্তমান যুগের আদালতগুলো সব সময়ই বিবাদমান একটি পক্ষের বিরোধী হয়ে থাকে ৷
চতুর্থত : পারিবারিক আদালত সত্য ও মিথ্যা নির্ণয় বা স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে কোন একজনকে শাস্তি দেয়ার জন্য গঠিত হয় না ৷ কারণ, এসব প্রশ্ন তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা আরো বাড়িয়ে দেয়৷ বরং পারিবারিক আদালত স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে মতভেদের বিষয়গুলো উপেক্ষা এবং উভয়ের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টির পথ নির্নয়ের চেষ্টা করে ৷ এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো, প্রথমত : পরিবারগুলোর মধ্যে বিবাদ ও তিক্ততার ব্যাপারে আত্মীয় স্বজন এবং সমাজের দায়িত্ব রয়েছে ৷ তাদের উচিত নয় এ ব্যাপারে উদাসীন থাকা ৷ রোগ দেখা দেয়ার আগে জীবন প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া উচিত তেমনি তালাক বা বিচ্ছিন্নতা দেখা দেয়ার আগেই তা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে হবে ৷
দ্বিতীয়ত : সালিশ বা মধ্যস্থতাকারী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও নারী ও পুরুষের সমান অধিকার রয়েছে ৷ উভয়ই শুধুমাত্র একজন মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করতে পারবেন ৷
তৃতীয়ত : মানুষ যদি সত্‍ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ কর্ম করে থাকে তাহলে আল্লাহও তাদেরকে সাহায্য করেন এবং এরফলে তারা ঐসব কাজে সফল হয় ৷ এবারে সুরা নিসার ৩৬ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক ৷
এই আয়াতের অর্থ হলো , 'তোমরা আল্লাহর বন্দেগী বা দাসত্ব কর ৷ কোন কিছুকে তার শরীক করবে না ৷ বাবা-মা আত্মীয়স্বজন এতিম বা দরিদ্র নিকট ও দূরের প্রতিবেশী সঙ্গী সাথী , পথচারী এবং তোমাদের অধিকারভূক্ত দাস দাসীদের প্রতি সত্‍ ব্যাবহার করবে ৷ নিশ্চয়ই আল্লাহ দাম্ভিক ও অহংকারীকে ভালোবাসেন না৷' একজন মোমেন ব্যক্তির পারিবারিক দায়িত্ব সম্পর্কিত কয়েকটি আয়াতের পর পরবর্তী কয়েকটি আয়াতে মোমেন ব্যক্তির সামাজিক দায়িত্বগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে৷ এই ধারাক্রমের কারণ হলো, মানুষ যেন এটা নাভাবে যে তারা শুধু স্ত্রী ও সন্তানদের ব্যাপারেই দায়িত্বশীল ৷ বরং আল্লাহর উপর ইমান রাখা ও আল্লাহর ইবাদত করা ছাড়াও মানুষের উচিত তাদের বাবা মা, আত্মীয়স্বজন , বন্ধু বান্ধব , প্রতিবেশী এবং দাসদাসী ও অধীনস্থদের সাথে ভালো ব্যবহার করা বা তাদের সেবায় নিয়োজিত থাকা ৷ বিশেষকরে এতিম ও অনাথদের ব্যাপারে দায়িত্ব অনুভূতি থাকা এবং তাদের সেবা ও উপকার করার ব্যাপারে উদাসীন না থাকা খুবই জরুরী ৷ একটি দুঃখজনক ব্যাপার হলো , অনেক ছেলে মেয়েরা বিয়ের পর বাবা মাকে ভুলে যায় এবং আত্মীয় স্বজনের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখে ৷ এ আয়াতের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দয়া ও দান খয়রাত করাকে মানুষের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করা হয়েছে ৷ সাধারণত দরিদ্র ও নিঃস্বদের সাহায্য করার ক্ষেত্রে দান খয়রাত শব্দটি ব্যবহৃত হয় ৷ কিন্তু শুধু গরিব বা দরিদ্রদের দয়া করতে হবে এমন কোন বাধ্য বাধকতা নেই ৷ অন্যদের জন্য যেকোন ভালো বা কল্যাণকর কাজ করা উচিত ৷ যেমন- বাবা মায়ের সেবা করা এবং তাদেরকে ভালোবাসাও সবচেয়ে ভালো কাজের অন্যতম দৃষ্টান্ত ৷ আয়াতের শেষাংশে বাবা-মা , এতিম, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন ও পথচারীদের সাথে ভালো ব্যবহারের উপর জোর দেয়া হয়েছে এবং যারা এদের সাথে ভালো ব্যবহার করে না তাদেরকে অহংকারী ও দাম্ভিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে ৷ এ আয়াতে শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো, প্রথমত : এ আয়াতে যেমন আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী করাকে মানুষের দায়িত্ব বলা হয়েছে তেমনি মানুষ ও আল্লাহর সৃষ্টির সেবা করা এবং তাদের দয়া করাকেও মানুষের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করা হয়েছে ৷ এটাই ইসলাম ধর্মের পরিপূর্ণতা ও সামাজিক বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গীর প্রমাণ ৷ দ্বিতীয়ত : শুধুমাত্র নামায রোজা ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিক ইবাদতই যথেষ্ঠ নয় ৷ জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও আল্লাহকে মনে রেখে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সাধনা করতে হবে ৷ তা না হলে মানুষ শিরকে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য ৷
তৃতীয়ত : মহান আল্লাহর পর বাবা-মা, সন্তানদের জন্ম দেয়া ও লালন পালনে মৌখিক ভূমিকা রাখেন ৷ তাই বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বাবা-মায়ের সন্তুষ্টি অর্জন ও তাদের সুখ এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা করাও সন্তানের দায়িত্ব ৷ চতুর্থত: এতিম, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও অধিনস্থ চাকর বা কর্মচারীদের অধিকার রক্ষা করা প্রত্যেক মানুষের জন্যেই জরুরী ৷ এবারে সুরা নিসার ৩৭ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো ৷ এ আয়াতের অর্থ হলো, 'যারা কৃপণতা করে ও মানুষকে কৃপণতার শিক্ষা দেয় এবং আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের যা দান করেছেন তা গোপন করে , আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন না ৷ তিনি সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের জন্য লাঞ্চনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন৷' এই আয়াতে বলা হচ্ছে , একদল মানুষ প্রচুর অর্থ ও সম্পদের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও নিজেরা তো দান খয়রাত করেই না একইসাথে অন্যরাও গরীবদের দান করুক তা চায় না ৷ কৃপণতা এবং সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী তাদের মধ্যে এত বিস্তৃত যে, এমনকি তারা নিজেদের বেলায়ও জীবন উপকরণ পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করে না ৷ দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষেরা তাদের সম্পদের কথা জেনে ফেলে হয়তো হাত পাততে আসবে এ ভয়ে তারা সম্পদ লুকিয়ে রাখে ৷ পবিত্র কোরআন এই কৃপণতাকে ঈমানের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছেন এবং এ ধরনের মানুষকে সত্য প্রত্যাখ্যানকারী বা কাফের হিসেবে অভিহিত করে বলেছে, কঠিন শাস্তি ও লাঞ্চনাই তাদের প্রাপ্য ৷ এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো, প্রথমত : কৃপণতার মতো কোন কোন মানসিক রোগ অনেক শারীরিক রোগের মতই ব্যাপক ও সংক্রমক ৷ কৃপণ লোকেরা অন্যদের দয়া ও দান খয়রাতের জন্যও বাধা ৷ দ্বিতীয়ত : আল্লাহর দেয়া বিভিন্ন নেয়ামতের শোকর করার একটা পন্থা হলো, নিয়ামতগুলোর কথা উল্লেখ্য করা ও সেগুলো ভোগ করা ৷ আল্লাহর দেয়া নিয়ামতের কথা গোপন করার অর্থ হলো নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা ৷ তৃতীয়ত : আল্লাহর দেয়া নেয়ামত তারই দয়া ও অনুগ্রহ মাত্র ৷ এসব আমাদের প্রচেষ্টার ফসল নয় , তাই এক্ষেত্রে কৃপণতা ও স্বার্থপরতারও কোন যু্িক্ত নেই ৷ এবারে সুরা নিসার ৩৮ ও ৩৯ নম্বর নিয়ে আলোচনা করবো ৷ এই দুই আয়াতের অর্থ হলো, 'যারা মানুষকে দেখানোর জন্য দান করে এবং পরকাল ও আল্লাহর প্রতি যাদের ঈমান নেই, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন না এবং যাদের সহচর শয়তান সে কতই না নিকৃষ্ট সঙ্গী ৷ যদি তারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতো এবং আল্লাহ তাদের যা দিয়েছেন তা থেকে দান করতো তাহলে তাদের কি ক্ষতি হতো ? আল্লাহ তাদের বিষয়ে ভালো জানেন৷' আগের আয়াতের বক্তব্য পূর্ণ করার জন্য এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে, কৃপণতার মনোভাব মানুষকে আল্লাহ ও পরকালের উপর বিশ্বাস থেকে দূরে সরিয়ে নেয় ৷ কারণ যাকাত দেয়া ও দান খয়রাত করা ঈমানের জন্য জরুরী এবং যারা এই ফরয বা আল্লাহর নির্দেশিত অবশ্যপালনীয় কর্তব্য পালনে বিরত থাকে তারা নিজেদের সম্পদকে আল্লাহর চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেয় ৷ সাধারণত এ ধরনের লোক কোন সময়ই তেমন কোন দান খয়রাত করে না ৷ যদি কখনো দান খয়রাত করেও থাকে তা সামাজিক মর্যাদা বা সম্মান রক্ষার জন্যে করে থাকে ৷ যেমন-স্কুল বা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা ৷ কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির কোন ইচ্ছা তাদের মধ্যে থাকে না বলে আল্লাহ পরকালে এসব দানের কোন প্রতিফলই দিবেন না ৷ বরং এজন্য শাস্তিও দিবেন ৷ মানুষ কোন সম্পদ দেয়ার পর যদি তা থেকে কোন প্রতিদান না পায় তাহলে এরচেয়ে বড় ক্ষতি আর কি হতে পারে ? আর এটাই হলো শয়তানের ষড়যন্ত্র৷ কারো কারো উপর শয়তানের ষড়যন্ত্র এতো গভীর যে পবিত্র কোরআন তাদেরকে শয়তানের সহযোগী বা বন্ধু বলে উল্লেখ করেছেন৷ এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো, প্রথমত : যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে দান খয়রাত করে, তাদের এসব তত্‍পরতা আর কৃপণতা ও দান খয়রাত না করার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই ৷ বরং লোক দেখানোর দান খয়রাত গোনাহ বলে এজন্য শাস্তিও পেতে হবে ৷ দ্বিতীয়ত : লোক দেখানো ভালো কাজ ঈমান না থাকারই লক্ষণ৷ কারণ এ ধরনের কাজের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে মানুষের প্রশংসা ও পুরস্কার পাবার আশা করা হয় ৷ তৃতীয়ত : শুধু অভূক্তদের পেট ভরানোকেই দান খয়রাত বলে না৷ কারণ, মানুষকে দেখানোর জন্যেও এ কাজ করা যায় ৷ দান খয়রাতের মূল উদ্দেশ্য হলো, আত্মিক আধ্যাত্মিক উন্নতি এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ৷ চতুর্থত : দান খয়রাত শুধু অর্থ সম্পদের মাধ্যমেই হয় না ৷ আল্লাহর দেয়া জ্ঞান সম্মান ও পদ মর্যাদার মতো অন্যান্য বিষয়কেও বঞ্চিত মানুষের সেবায় ব্যবহার করা উচিত ৷ #

 

  কোরআনের আলো
  ( ১২৩ তম পর্ব )

সুপ্রিয় পাঠক ! কোরআনের আলোর আজকের পর্বে আমরা সুরা নিসার ৪০ নম্বর আয়াত থেকে আলোচনা শুরু করবো৷ প্রথমে এই আয়াতের অর্থ হলো, 'নিঃসন্দেহে আল্লাহ বিন্দুমাত্র জুলুমও করেন না এবং তিনি সত্‍কাজের দ্বিগুণ প্রতিদান দিয়ে থাকেন এবং আল্লাহ তার কাছ থেকে মহাপুরস্কার দান করে থাকেন৷' আগের আয়াতে বলা হয়েছে , 'যারা বঞ্চিত ও দরিদ্রদের দান খয়রাত করে না, তারা আল্লাহর নেয়ামতের ব্যাপারে কুফরি করছে অথর্াত্‍ আল্লাহর নেয়ামতকে অস্বীকার করছে এবং এই কুফরির জন্য তাদেরকে শাস্তি পেতে হবে৷' আর এ আয়াতে বলা হচ্ছে, 'আল্লাহর দেয়া শাস্তির অর্থ তিনি বান্দাদের ওপর জুলুম করেন না, বরং এসব শাস্তি মানুষেরই কাজের পরিণাম মাত্র৷' পাপের উত্‍স হল, হয় অজ্ঞতা অথবা ভুল চিন্তাধারা বা উন্মাদনা, কিংবা লোভ লালসা বা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের খাহেশ৷ কিন্তু আল্লাহ এসব ত্রুটি বিচ্যতি থেকে মুক্ত বলে, নিজের সৃষ্টির ওপর জুলুম করার কোন প্রয়োজনই তাঁর নেই৷ মানুষ নিজেই নোংরা কাজে লিপ্ত হয়ে নিজের ওপর জুলুম করে৷ আয়াতের অন্য অংশে বলা হয়েছে, 'আল্লাহ সত্‍কাজ করতে মানুষকে আহবান জানাচ্ছেন, যারা এই আহবানে সাড়া দিবেন আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও পরকালে পুরষ্কার দেবেন এবং সে পুরস্কার ও হবে কয়েকগুন ৷ এটা মানুষের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ৷' অন্যান্য আয়াতে আল্লাহ আন্তরিক দান খয়রাতের জন্য ৭০০ গুন প্রতিদান দেয়ার কথা বলেছেন৷ এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
ক্স পৃথিবীতে আমাদের বিপদ ও দূর্যোগ আল্লাহর পক্ষ থেকে জুলুম নয়, বরং এগুলো আমাদের কৃপণতা এবং কুফরি মনোভাবের ফল৷ অথর্াত্‍ আমরা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করি৷
ক্সক্স আল্লাহ ঠিক পাপ অনুপাতেই পাপের শাস্তি দিয়ে থাকেন, পাপের তুলনায় এক বিন্দুও বেশী শাস্তি তিনি দেন না৷ কিন্তু তিনি ভালো কাজের পুরষ্কার অনেকগুণ বেশী দিয়ে থাকেন৷
এবারে সুরা নিসার ৪১ ও ৪২ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো৷ এই দুই আয়াতের অর্থ হলো, 'হে নবী সে দিন তাদের কি অবস্থা হবে, যখন আমি প্রত্যেক ধর্ম সমপ্রদায় থেকে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং আপনাকেও তাদের প্রতি সাক্ষী করবো ? যারা অবিশ্বাসী হয়েছে এবং নবী রাসুলদের বিরুদ্ধাচারণ করেছে, তারা সেদিন বলবে, হায়! আমরা যদি মাটির সাথে মিশে যেতাম ৷ আর সেদিন তারা আল্লাহর কাছে কোন কথাই গোপন করতে পারবে না৷' আল্লাহ যে কারো ওপর জুলুম করেন না, তার সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হলো, পরকালে আল্লাহর বিচারালয়ে মানুষের তত্‍পরতার অনেক সাক্ষী থাকবে৷ মানুষের শরীরের বিভিন্ন অংশের সাক্ষ্য ছাড়াও, ফেরেশতাদের সাক্ষ্য এবং এমনকি মানব জাতিগুলোর কাছে পাঠানো নবী রাসুলদেরও সাক্ষ্য নেয়া হবে৷ অবশ্য ইসলামের নবী (সঃ) তাঁর উম্মতদের সাক্ষী হওয়া ছাড়াও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হিসেবে অন্যান্য নবীদের জন্যেও সাক্ষী হবেন৷ তিনি হবেন সমস্ত তত্‍পরতার মানদন্ড৷ পরকালের বিচারে তাঁর উপস্থিতি ও সাক্ষ্য দেখে নবীর বিরোধীরা এবং কাফেররা তখন বলবে হায়, আমাদের যদি জন্মই না হত এবং মৃতু্যর পর যদি চিরকাল মাটিতেই মিশে থাকতাম৷ কিন্তু তখন এই সব আক্ষেপ আর হা গুতাশ কোন কাজে আসবে না৷ কারণ, পৃথিবীতে তাদেরকে যে জীবন ও সময় সুযোগ দেয়া হয়েছে তা শেষ হয়ে গেছে৷ তাই কিয়ামতে এতসব সাক্ষ্য প্রমাণ থাকবে বলে কোন খারাপ কাজেই ঢেকে রাখা যাবেনা৷ এছাড়াও আল্লাহর কাছে কারো কোন কথা ও চিন্তাও গোপন থাকে না৷ এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
ক্স মানুষের তত্‍পরতার ক্ষেত্রে নারীরাই হলেন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সাক্ষী ও মানদন্ড৷ মানুষের বিচারের জন্য বিচার দিবসে আল্লাহ এটাই দেখবেন যে, কারা তাদের কাছে পাঠানো নবীদের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করেছে এবং কারা তা করেনি৷ আর এরই ভিত্তিতে তিনি মানুষকে শাস্তি বা পুরস্কার দিবেন৷
ক্স আল্লাহ কোন সাক্ষীরই মুখাপেক্ষী নন৷ কারণ, তিনি সবই জানেন ও দেখেন৷ কিন্তু আল্লাহ মানুষকে এটা বোঝাতে চান যে, আল্লাহ ছাড়া অন্যরাও কিয়ামতের দিন মানুষের খারাপ কাজের ব্যাপারে সাক্ষ্য দেবেন৷ আল্লাহর এই সতর্কবানী বহু মানুষকেই সত্‍ থাকার জন্য উত্‍সাহিত করে৷
ক্স নবীর সুন্নত ও নির্দেশ অমান্য করা আল্লাহর নির্দেশ লংঘন তথা কুফরির শামিল৷
ক্স কিয়ামত বা পুনরুত্থান হল অনুতাপ আর অনুশোচনার দিন৷ সেদিন অনেকেই বলবে, হায় যদি মাটি হতাম বা মাটি থেকে আবার আমাদের জীবিত করা না হত !
এবারে সুরা নিসার ৪৩ নম্বর আয়াতের অর্থ নিয়ে আলোচনা করা যাক৷ এই আয়াতের অর্থ হলো, 'হে মুমিনগণ, তোমরা মাতাল অবস্থায় নামাজের কাছে যেও না, যে পর্যন্ত তোমরা যা বল , তা বুঝতে না পার৷ আর মুসাফির না হয়ে থাকলে অপবিত্র অবস্থায় নামাজের স্থান বা মসজিদেও যাবেনা, যে পর্যন্ত না তোমরা গোসল করবে৷ তবে এসব স্থান অতিক্রম করা যাবে৷ আর যদি তোমরা অসুস্থ হও অথবা সফরে থাক, অথবা তোমাদের মধ্যে কেউ শৌচাগার থেকে আসে , অথবা তোমরা স্ত্রী-গমন কর এবং এসব ক্ষেত্রে পানি না পাও তাহলে পবিত্র মাটি দিয়ে তোমাদের মুখ ও হাত মুছে ফেল অথর্াত্‍ তায়াম্মুম কর৷ নিশ্চয়ই আল্লাহ পাপ মোচনকারী, ক্ষমাশীল৷' এই আয়াতে নামাজের কিছু বিধান বর্ণনার আগে প্রথমে নামাজের মূল চেতনা বা আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করার কথা বলা হয়েছে৷ এরপর গোসল ও তায়াম্মুমের বিধান উল্লেখ করা হয়েছে৷ নামাজসহ অন্যান্য ইবাদতের মূল লক্ষ্য হল মানুষ যেন তাঁর স্রষ্টার প্রতি স্থায়ীভাবে মনোযোগী হয় এবং একমাত্র আল্লাহর ওপরই নির্ভর করে৷ যে মানুষের হৃদয় আল্লাহর প্রেমে বা আল্লাহর আকর্ষণে বাঁধা , তিনি সব মুখাপেক্ষীতা ও সব নির্ভরশীল থেকে মুক্ত হন৷ তাই যেসব বিষয় মানুষকে নামাজে পূর্ণ সচেতনতার পথে বাধা সৃষ্টি করে, সে সব বর্জন করতে বলা হয়েছে৷ যেমন - এ আয়াতে মদ বা মাদকতা সৃষ্টিকারী দ্রব্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্য কয়েকটি আয়াতে অসুস্থ ও তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় নামাজ না পড়ার নির্দেশ দেখা হয়েছে৷ নামাজে দাঁড়ালে মানুষকে এটা মনে রাখতে হবে যে, তাঁরা আল্লাহর সামনে উপস্থিত৷ তাঁদের এটাও বুঝতে হবে তাঁরা আল্লাহর সামনে কি বলছেন এবং আল্লাহর কছে কি প্রার্থনা করছেন ? মানুষের মনকে আল্লাহমুখী বা আল্লাহর প্রতি মনোযোগী করা ছাড়াও মানুষের শরীরকেও সব ধরনের কদর্যতা থেকে পবিত্র ও পরিষ্কার রাখতে হবে৷ তাই স্ত্রী- মিলনের পর বা অপবিত্র অবস্থায় নামাজ পড়া তো দূরের কথা নামাজের স্থান মসজিদেও যাওয়া যাবেনা৷ জরুরী অবস্থা দেখা দিলে মসজিদের এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করে দ্রুত অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে৷ কিন্তু সফরে থাকা অবস্থায় ফরজ গোসলের জন্য প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া না গেলে বা কোন অসুস্থতার কারণে পানি ব্যবহার করা ক্ষতিকর হলে মানুষ পবিত্র মাটি ছুঁয়ে তথা তায়াম্মুমের মাধ্যমে পবিত্র হতে পারে এবং নামাজ আদায় করতে পারে৷ এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
নামাজ অর্থ শুধু বারবার কিছু কথা বলা আর অঙ্গভঙ্গী করা নয়৷ নামাজের প্রাণ হলো আল্লাহর প্রতি মনোযোগ আর এ জন্যে সচেতনতা জরুরী৷
মসজিদ ও ইবাদতের স্থান পবিত্র এবং এসবের মর্যাদা রয়েছে৷ তাই অপবিত্র অবস্থায় এসব স্থানে যাওয়া উচিত নয়৷
মন ও শরীর পবিত্র করা আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবার ও আল্লাহর সাথে কথা বলার পূর্বশর্ত ৷
সফর ও অসুস্থতার সময় ও সামাজ পড়তে হবে৷ তবে এসব ক্ষেত্রে নামাজের বিধানে কিছু ছাড় দেয়া হয়েছে৷ #

  কোরআনের আলো
   (