কোরআনের আলো

(১৩১ তম পর্ব)


কোরআনের আলোর এ পর্বে সূরা নিসার ৭৪ নম্বর আয়াত থেকে আলোচনা শুরু করবো ৷ এ আয়াতে বলা হয়েছে, "সুতরাং যারা পরকালের বিনিময়ে পার্থিব জীবন বিক্রয় করে, তারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করুক এবং যারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে তারা শহীদ হোক, কিংবা বিজয়ী হোক আল্লাহ তাদেরকে মহাপুরস্কার দান করবেন ৷" গত আলোচনায় বলেছিলাম, মোনাফিক লোকদের লক্ষণ হলো, তারা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে জিহাদে অংশ নেয়া থেকে বিরত থাকে এবং এমনকি অন্যদেরকেও বিরত রাখে ৷ এই আয়াতে ঐ বক্তব্যের জের ধরে বলা হচ্ছে-জিহাদ থেকে পালিয়ে যাওয়া আল্লাহ ও পরকালের প্রতি অবিশ্বাসের লক্ষণ ৷ যদি কেউ পরকালের মহাপুরস্কারের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং দুনিয়ার অস্থায়ী জীবনকে পরকালের স্থায়ী জীবনের জন্য কৃষিক্ষেত্র মনে করে, তাহলে তার উচিত আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করা
৷ কারণ মুমিন বা বিশ্বাসী মুসলমানরা জানেন আল্লাহর শত্রুদের হামলার হাত থেকে ধর্মের পবিত্রতা রক্ষা করা তাদের দায়িত্ব এবং তারা এই দায়িত্ব পালনের জন্যই সচেষ্ট হয়, এর ফলাফলের জিম্মাদার তারা নয় ৷ যুদ্ধের ফলে জয় বা পরাজয় যাই হোক না কেন তা তাদের জন্য সমান ৷ জয় বা পরাজয় উভয় ক্ষেত্রেই তারা বিজয়ী ৷ কারণ আল্লাহর পথে থাকা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করাই বেশী গুরুত্বপূর্ণ, শত্রুর ওপর বিজয়ী হওয়া এর তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ ৷ এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
প্রথমত : ধর্মযুদ্ধ বা জিহাদের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ধর্ম রক্ষা করা৷ দেশের সীমানা বৃদ্ধি, প্রতিশোধ নেয়া কিংবা উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা জিহাদের উদ্দেশ্য নয় ৷
দ্বিতীয়ত : ঈমানদারদের পরীক্ষার একটি ক্ষেত্র হলো যুদ্ধের ময়দান ৷ যুদ্ধই মুমিন ও মোনাফিকের মধ্যে পার্থক্য সূচিত করে ৷
তৃতীয়
: সত্যের সংগ্রামে পলায়ন ও পরাজয়ের কোন অস্তিত্ব নেই৷ মানুষ হয় শহীদ হবে অথবা গাজী বা বিজয়ী হবে ৷

 
এবারে সূরা নিসার ৭৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক ৷ এ আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাত্‍ "তোমাদের কি হয়েছে যে তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করছ না অসহায় নারী, পুরুষ ও শিশুদের রক্ষার জন্যে? যারা বলে জালেম লোকদেরকে এ অঞ্চল থেকে অন্যত্র নিয়ে যাও, তোমার কাছ থেকে কাউকে আমাদের অভিভাবক কর এবং তোমার কাছ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী পাঠাও ৷"
আগের আয়াতে আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসের কারণে জিহাদে অংশ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে ৷ আর এই আয়াতে মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে বলা হচ্ছে-যারা অত্যাচারীদের হাতে পিড়ীত তাদেরকে মুক্ত করার জন্য যুদ্ধ করা উচিত এবং নীরব থাকা উচিত নয় ৷ এই আয়াত থেকে এটা স্পষ্ট যে, জালেমদের হাত থেকে নিপীড়িত লোকদের রক্ষা করা ও তাদের মুক্তি দেয়া ইসলামী সংগ্রাম তথা জিহাদের অন্যতম উদ্দেশ্য ৷ মজলুমদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করা আল্লাহর রাস্তায় হিজাদের শামিল ৷ স্বধর্মী ও স্বজাতির প্রতি মুমিনের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে ৷ স্বদেশ ও স্বধর্মের লোক যখন কষ্ট পাচ্ছে তখন শুধু নিজের এবং পরিবারের সুখের চিন্তা করা মুমিনের লক্ষণ নয় ৷ এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে,
প্রথমত : ধর্মযুদ্ধ বা ইসলামী জিহাদ শুধু ধর্মের স্বার্থেই হয় না, মানবীয় স্বার্থ রক্ষাও এর লক্ষ্য৷ মানুষকে মুক্তি দেয়ার সংগ্রাম ধর্মেরই সংগ্রাম ৷
দ্বিতীয়ত : মজলুম ও নিপীড়িত জনগণের ফরিয়াদ এবং কান্নার ব্যাপারে উদাসীন থাকা একটি বড় পাপ ৷ সাহস ও শক্তি নিয়ে মজলুমের পক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলা উচিত ৷
তৃতীয়ত : অত্যাচারীদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আল্লাহ এবং আল্লার প্রিয় বান্দাদের কাছ থেকে সাহায্য চাইতে হবে ৷ এ ক্ষেত্রে যার-তার কাছ থেকে যে কোন ধরণের সাহায্য বা অপমানজনক শর্তযুক্ত সাহায্য গ্রহণ করা ঠিক নয় ৷


এবারে সূরা নিসার ৭৬ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক ৷ এ আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাত্‍ "যারা বিশ্বাসী তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে এবং যারা অবিশ্বাসী তারা শয়তানের পথে যুদ্ধ করে ৷ সুতরাং তোমরা শয়তানের অনুসারী ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর ৷ নিশ্চয় শয়তানের কৌশল দুর্বল ৷"
ইসলামী জিহাদ ও অবিশ্বাসীদের যুদ্ধের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করার উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ এ আয়াতে বলছেন, ঈমানদাররা শুধু আল্লাহর ধর্ম রক্ষা এবং তা শক্তিশালী করার জন্য যুদ্ধ করে, ক্ষমতা বা পদের জন্য নয় ৷ মুমিনের জন্য শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ৷ কিন্তু কাফেররা খোদাদ্রোহী শক্তি ও জালেমদের শাসন শক্তিশালী করার জন্য যুদ্ধ করে৷ তাদের লক্ষ্য অন্যদের ওপর কর্তৃত্ব করা এবং নিজ দেশের সীমানা বৃদ্ধি করা ৷ এরপর আল্লাহ আধিপত্যকামী এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে উত্‍সাহ যুগিয়ে বলছেন, তোমরা মনে করো না যে, কাফেররা শক্তিশালী ও তোমরা দুর্বল ৷ বরং বাস্তবতা এর বিপরীত৷ তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমানের কারণে সর্বোচ্চ শক্তির অধিকারী ৷ অন্যদিকে তোমাদের শত্রুরা শয়তানের অনুসারী বলে অত্যন্ত দুর্বল ৷ তাই কাফের ও তাগুতি শক্তির সাথে সংগ্রাম করতে ভয় পেয়ো না এবং সর্বশক্তি দিয়ে কুফুরি শক্তির সাথে যুদ্ধ কর ৷ তোমরাই শ্রেষ্ঠ এবং শয়তানের অনুসারীরা আল্লাহর ইচ্ছার মোকাবেলায় অত্যন্ত দুর্বল ও অক্ষম ৷
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
প্রথমত : ফি সাবিলিল্লাহ অর্থ-আল্লাহর পথে থাকা৷ জীবনের সব ক্ষেত্রে এটাই মুমিন ও ইসলামী সমাজের লক্ষ্য৷
দ্বিতীয়ত : ঘরে বসে থাকা এবং উদাসীনতা মুমিনের লক্ষণ নয়৷ বরং খোদাদ্রোহী ও অসত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামই মুমিনের লক্ষ্য৷
তৃতীয়ত : কাফের, তাগুত বা ইসলাম বিরোধী স্বৈরশক্তি ও শয়তান এরা একই ত্রিভুজের তিন দিক এবং এগুলো একটি অপরটির উপর নির্ভরশীল ৷ অর এ জন্যই এগুলো একে অপরকে শক্তিশালী করার জন্য সচেষ্ট ৷
চতুর্থত : শয়তানকে অনুসরণের পরিণতি হলে-ব্যর্থতা ও বিভ্রান্তি৷ কারণ শয়তানের অনুসারীদের প্রতি তার সাহায্য দুর্বল ও নগণ্য ৷ #

কোরআনের আলো

( ১৩২ তম পর্ব)


কোরআনের আলোর এ পর্বে আমরা সূরা নিসার ৭৭ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো৷ এই আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাত্‍ " আপনি কি তাদের দেখেননি, যাদেরকে মক্কায় বলা হয়েছিল তোমরা জিহাদ থেকে তোমাদের হাতকে নিবৃত রাখ, শুধু নামাজ পড় এবং জাকাত দাও, তখন তারা প্রতিবাদী হয়েছিল ও যুদ্ধের দাবী জানিয়েছিল ৷ কিন্তু যখন মদিনায় তাদেরকে জিহাদের আদেশ দেয়া হলো, তখন তাদের এক দল জনগণকে এমন ভয় দেখাতে লাগলো যেন তারা মানুষকে আল্লাহর ভয়ের চেয়েও বেশী ভয় দেখাচ্ছে ৷ তারা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক, কেন আমাদেরকে যুদ্ধের আদেশ দিলে? কেন আমাদেরকে আরো কিছুকাল অবসর দিলে না? হে নবী আপনি তাদের বলুন, পার্থিব জীবন খুবই সামান্য এবং খোদাভীরুদের জন্য পরকালই কল্যাণকর ৷ তোমাদের ওপর সামান্য পরিমাণ জুলুমও করা হবে না ৷"
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী মুসলমানরা যখন মক্কায় ছিল, তখন মুশরিকদের উত্‍পীড়ন ও নির্যাতনের কারণে তাদের মধ্যে একদল মহানবী(সা:)এর কাছে এসে বললো, ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হবার আগে আমরা মুশরিকদের কাছে প্রিয় ছিলাম ৷ কিন্তু এখন তাদের কাছে আর আমাদের সম্মান নেই এবং আমরা সব সময়ই শত্রুদের অত্যাচার ও উত্‍পীড়নের শিকার হচ্ছি ৷ আমাদেরকে যুদ্ধ করতে দিন যাতে আমরা পুনরায় সম্মান অর্জন করতে পারি ৷ মহানবী(সা:) তাদেরকে বললেন, আমি এ মুহূর্তে সংগ্রামের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত নই, আপনারা নামাজ আদায় ও জাকাত দেয়ার মত ব্যক্তিগত এবং সামাজিক দায়িত্ব পালন করুন ৷ এরপর যখন মদিনায়(সা:) ও মুসলমানদের হিজরতের পর আল্লাহর পক্ষ থেকে জিহাদের নির্দেশ আসলো তখন যুদ্ধের জন্য অতি আগ্রহী ঐ ব্যক্তিরা বিভিন্ন অজুহাত দেখাতে লাগলো এবং জিহাদে অংশ নেয়া থেকে বিরত হলো ৷ ঠিক তখনই এ আয়াত নাজেল হয় এবং এতে ঐ লোকদের দ্বিমুখী আচরণের প্রতিবাদ করা হয়েছে ৷ যদিও ইসলামের প্রাথমিক যুগের একদল মুসলমানের ঐ রকম কপট আচরণ ছিল এই আয়াত নাজিলের উপলক্ষ্য কিন্তু বাস্তবে এ ধরণের ঘটনার নজীর সব যুগেই দেখা যায় ৷ সমাজে সব সময়ই এমন একদল লোক থাকে যারা চরম পন্থা অনুসরণ বা বাড়াবাড়ি করতে অভ্যস্ত ৷ এইসব লোক কখনও কখনও সমাজের নেতার চেয়েও বেশী সক্রিয় হয়ে ওঠেন, আবার কখনও সমাজের সাধারণ লোকের চেয়েও ধীরগতির হন ৷ আসলে এ ধরনের লোক নিজেদের দায়িত্ব বোঝার ও তা পালনের চেষ্টা করে না ৷ বরং তারা সাগরের ঢেউয়ের মত উত্তাল হয় এবং যখন ঢেউ তীরে পৌছে, তখনই বুদ বুদের মত মিলিয়ে যায় ৷ এ ধরণের মানুষ মুখে মুখে খুব সাহসিকতা দেখালেও অন্তরের দিক থেকে খুবই ভীরু ৷ এই আয়াতে শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে,
প্রথমত : ধর্মীয় বিধান পর্যায়ক্রমিক ৷ ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী একমাত্র তারাই জিহাদ ও সংগ্রামের যোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম, যারা নামাজ পড়েছে, জাকাত দিয়েছে এবং নিজের ভেতরের শয়তান ও প্রবৃত্তির সাথে সংগ্রাম করেছে ৷
দ্বিতীয়ত : সামাজিক সমস্যাদির ব্যাপারে কখনোই উত্তেজিত হয়ে কিছু করা ঠিক নয় ৷ এ সব ক্ষেত্রে ন্যায় পরায়ন ও দূরদর্শী নেতৃবৃন্দ যা বলেন তাই মেনে চলা উচিত ৷


এবারে সূরা নিসার ৭৮ ও ৭৯ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক ৷ এই দুটি আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাত্‍ "তোমরা যেখানেই থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদের আক্রমণ করবেই, এমনকি সুদৃঢ় দূর্গে থাকলেও তোমরা মৃত্যু এড়াতে পারবে না ৷ যদি মোনাফিকরা বিজয়ী হয় বা তাদের ওপর কোন কল্যাণ অবতীর্ণ হয় তখন তারা বলে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়েছে ৷ আর যদি তাদের জন্য খারাপ কিছু ঘটে, তখন তারা বলে এটা নবীর কাছ থেকে হয়েছে ৷ আপনি বলুন সব কিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে হয় ৷ ঐ সম্প্রদায়ের কি হয়েছে যে তারা সত্য বুঝতে ও মানতে প্রস্তুত নয়? হে নবী! আপনার ওপর যে কল্যাণ নাজিল হয় তা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়, আর আপনার ওপর মন্দ যা কিছু হয় তা আপনার আশ পাশ থেকেই হয় এবং আমরা আপনাকে মানুষের জন্য রাসুল হিসাবে পাঠিয়েছি ৷ আল্লাহই সাক্ষী হিসাবে যথেষ্ট ৷"

আগের আয়াতে দূর্বলমনা মুসলমানদের কথা বলা হয়েছে ৷ জিহাদে অংশ না নেয়ার জন্য তারা অজুহাত দেখাতো এবং জিহাদ বিলম্বিত করার দাবী জানাতো ৷ এই দুই আয়াতে তাদের উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছে, মনে করো না জিহাদ থেকে পালিয়ে গেলেই মৃত্যু থেকে রক্ষা পাবে ৷ খুব সুদৃঢ় দরজা বিশিষ্ট সুরক্ষিত দূর্গে বাস করলেও মৃত্যু ঠিকই তোমাদেরকে সময়মত গ্রাস করবে ৷ তারাই সৌভাগ্যবান যারা নিজেদের জীবনকে আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিয়ে অর্থাত্‍ শহীদ হয়ে অমরত্ব লাভ করবে ৷ এরপর মহানবী(সা:)এর প্রতি মোনাফিকদের বেয়াদবীপূর্ণ আচরণের দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলছেন, "যখনই তোমরা যুদ্ধে জয়ী হও তখন একে আল্লাহর দয়া বলে উল্লেখ কর, কিন্তু পরাজিত হলে একে অদক্ষ পরিচালনার ফল বলে ঘোষণা কর ৷ অথচ সব কিছু আল্লাহর ইচ্ছাতেই ঘটে ৷ আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া জয় বা পরাজয় কোনটাই সম্ভব নয় ৷ তবে আল্লাহর ইচ্ছাও অযৌক্তিক নয় ৷ যদি তোমরা তোমাদের দায়িত্ব ঠিক মত পালন কর তাহলেই আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেন এবং বিজয়ী করার সিদ্ধান্ত নেন ৷ আর তোমরা যদি নিস্ক্রিয় থাকো তাহলে পরাজয়কে আল্লাহ তোমাদের ভাগ্যলিপি করেন ৷
আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক হলো ভূপৃষ্ঠের সাথে সূর্য্যের সম্পর্কের মত ৷ সূর্য্যের চারদিকে ফেরার সময় পৃথিবীর যে দিকে রোদ পড়ে সে দিকটা আলোকিত হয় এবং তাপ সঞ্চয় করে৷ যে দিকে রোদ পড়ে না সে দিকটা অন্ধকার ও শীতল হয় ৷ তাই বলা যায় পৃথিবীর আলো আসে সূর্য্য থেকে কিন্তু অন্ধকার দিকের জন্য পৃথিবীই দায়ী ৷ মানুষের অবস্থাও একই রকম ৷ মানুষ আল্লাহ মুখী হলেই সাহায্য পায়, বিজয়ী হয় কিন্তু আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করলে সকল অস্তিত্বের স্রষ্টার দয়া থেকে সে বঞ্চিত হয় ৷ অবশ্য এটা শুধু ঈমানদার ও পবিত্র অন্তরের অধিকারীরাই বুঝতে পারেন এবং মেনেও নেন ৷ কিন্তু অসুস্থ হৃদয়ের লোকেরা তা বুঝেও না এবং মেনেও নেয় না ৷ কারণ এসব লোক আল্লাহর পরিবর্তে নিজেদেরকেই সব কিছুর কেন্দ্র বলে মনে করে ৷ শুধু নিজেদেরকেই ন্যায়পন্থী মনে করে এবং তাদের পক্ষে নয় এমন সবাইকে বিভ্রান্ত বলে মনে করে৷ অথচ সত্য ও মিথ্যার মানদন্ড হলেন আল্লাহ, তারা নয় ৷
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
প্রথমত : মৃত্যু যখন অবধারিত অর্থাত্‍ একদিন সবাইকেই যখন মরতে হবে তখন জিহাদ থেকে পালিয়ে যাওয়া অর্থহীন ৷
দ্বিতীয়ত : নিজের পাপকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়া ঠিক নয় ৷ নিজের অপরাধ বা ভুল ঢাকার জন্য দায়িত্ব এড়ানো উচিত নয় ৷
তৃতীয়ত : জীবন ও মৃত্যু তিক্ততা ও মিষ্টতা এবং অন্য সব কিছুই আল্লাহর বিজ্ঞ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঘটে ৷
চতুর্থত : খোদায়ী দৃষ্টিতে সব পূর্ণতা ও সৌন্দর্য আল্লাহ থেকে উদ্ভুত এবং যা কিছু দুর্বলতা বা অপূর্ণতা তার জন্য আমরাই দায়ী ৷
পঞ্চমত : মহানবীর মিশন বিশ্বজনীন, এই মিশন কোন নির্দিষ্ট এলাকা বা জাতির জন্য সিমীত নয় ৷
তাই আমরা যেন সৃষ্টি জগত ও মানুষের সাথে আল্লাহর সম্পর্কের বাস্তবতা বুঝতে পারি এবং কখনোই নিজেদের অপরাধ যেন আল্লাহ ও অন্যের ঘাড়ে চাপানোর মত ভুল না করি আল্লাহর কাছে এই তৌফিক কামনা করে কোরআনের আলোর এ পর্বের আলোচনা শেষ করছি ৷ # ( ‍আপডেট-০২ মে ২০০৭)

 

কোরআনের আলো

( ১৩3 তম পর্ব)


কোরআনের আলোর এ পর্বে আমরা সূরা নিসার ৮০ নম্বর আয়াত থেকে আলোচনা শুরু করবো ৷ এ আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাত্‍ " কেউ রাসুলের অনুসরণ করলে সে তো আল্লাহরই অনুসরণ করলো ৷ আর যারা আপনার অর্থাত্‍ রাসুলের অনুগত্য করলো না, তারা জেনে রাখুক আমরা আপনাকে তাদের প্রহরী করিনি ৷"

সমাজ বা রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান মূলনীতি হলো, সামাজিক নেতৃত্ব ও নীতির ধারাক্রম নির্ধারণ এবং এই ধারাক্রমের প্রতি জনগণের আনুগত্য ৷ আমরা আগেও বহুবার বলেছি ইসলাম ধর্ম শুধুমাত্র কিছু ব্যক্তিগত ইবাদত ও বিধি-বিধানের সমষ্টি নয় ৷ বরং ইসলাম ব্যক্তির সৌভাগ্য ও মুক্তিকে সমাজের সৌভাগ্য এবং সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যক্তির সক্রিয় উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল বলে মনে করে ৷ জাকাত, হজ্ব ও জিহাদের মত ইসলামী বিধানগুলো এসব সামাজিক ক্ষেত্রে এবং নীতির কিছু দৃষ্টান্ত ৷ এইসব নীতি বা বিধানকে সমাজে বাস্তবায়িত করা এবং এ সম্পর্কে তদারক করার জন্য নিশ্চিত গ্যারান্টি হলো রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ৷ পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিতে মহানবী(সাঃ) শুধু আল্লাহর বিধান প্রচারের জন্য দায়িত্বশীল নন ৷ তিনি নিজেই ইসলামী সমাজের শাসনকর্তা এবং তাঁর আনুগত্য করার অর্থ হলো আল্লাহরই নির্দেশ মান্য করা ৷ আর তার নির্দেশ অমান্য করার অর্থ হল-খোদাদ্রোহীতা বা কুফরি করা ৷ মহানবী (সাঃ) এর রাষ্ট্রীয় নির্দেশ ছাড়াও তার বক্তব্যের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে ৷ পবিত্র কোরআন তথা আল্লাহর বাণীর পরই মহানবী (সঃ)এর বাণী তথা সুন্নাতকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয়া হয় ৷ নবী এবং এমনকি রাষ্ট্র প্রধান হিসাবেও মহানবী (সাঃ) এর দায়িত্বের একটি সীমাবদ্ধতার কথা এ আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে ৷ এতে বলা হয়েছে, মহানবী (সাঃ) জনগণকে সত্য মেনে নিতে এবং তা বাস্তবায়নে জনগণকে বাধ্য করার জন্য দায়িত্ব প্রাপ্ত নন ৷ সমাজকে সু-পথ দেখানো এবং নেতৃত্ব দেয়াই তার দায়িত্ব ৷ খোদায়ী বিধান পালনে জনগণকে বাধ্য করা তার দায়িত্ব নয় ৷ এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে,
প্রথমত: আল্লাহর আনুগত্যের অর্থ শুধু নামাজ, রোজা পালন নয়, সমাজের ধর্মীয় নেতার আনুগত্য করাও আল্লাহর নির্দেশের অন্তর্ভূক্ত ৷
দ্বিতীয়ত: ধর্মের প্রচারই নবীগণের দায়িত্ব ৷ ধর্ম চাপিয়ে দেয়া তাঁদের দায়িত্ব নয় ৷ মানুষকে স্বেচ্ছায় ধর্ম নির্বাচন করতে হবে ৷

এবারে সূরা নিসার ৮১ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক ৷ এ আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাত্‍ "আপনার সামনে উপস্থিত মোনাফিকরা বলে আমরা অনুগত ৷ কিন্তু তারা যখন আপনার কাছ থেকে বের হয়ে যায়, তখন তাদের একদল রাতে মিলিত হয়ে উল্টো কথা বলে ৷ কিন্তু রাতে তারা যা শলাপরামর্শ করে আল্লাহ তা লিপিবদ্ধ করেন ৷ তাই আপনি তাদের উপেক্ষা করুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন, কার্য সম্পাদনে বা পৃষ্টপোষতার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট ৷"

এই আয়াতে পুনরায় মোনাফিকদের বিপদ সম্পর্কে মহানবী (সাঃ) ও মুসলমানদেরকে সাবধান করে দিয়ে বলা হচ্ছে, মুসলমানদের মধ্যে মোনাফিক লুকিয়ে আছে ৷ এরা উপরে উপরে মহানবী (সাঃ) এর আনুগত্য ও মুসলমানদের সাহায্য করার কথা বললেও রাতের বেলায় গোপন বৈঠকে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং মুসলমানদের পরিকল্পনা বানচালের চেষ্টা করছে ৷ এ ধরনের লোকদের মোকাবেলার উপায় হলো, তাদেরকে চিনে রাখা এবং তাদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখা ৷ মুসলমানরা যেন মোনাফিকদের অসহযোগিতা এবং তাদের অন্তর্ঘাতী তত্‍পরতা বা বাধা বিঘ্নে ভীত না হয় ৷ কারণ আল্লাহ তাদের বক্তব্য ও সিদ্ধান্তের কথা জানেন এবং সময় মত তাদের ষড়যন্ত্র বানচাল করবেন ৷ তাই শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে এবং তাঁর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে ৷ এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
প্রথমত: ঘরের শত্রুদের সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত ৷ শুধু সীমান্তের বাইরেই শত্রু  আছে এমন ধারণা করা ঠিক নয় ৷
দ্বিতীয়ত: শোনা মাত্রই কোন কথা বা বক্তব্য বিশ্বাস করা উচিত নয় ৷ বরং যেখানেই তোষামোদ বা অতি ভক্তির তত্‍পরতা দেখা যাবে সেখানে বিপদের সম্ভাবনা আছে বলে মনে করতে হবে ৷
তৃতীয়ত: আল্লাহই মুমিনদের প্রকৃত বন্ধু ও রক্ষাকারী ৷ আল্লাহ প্রকাশ্যে এবং অপ্রকাশ্যে মুমিনদের রক্ষা ও সাহায্য করেন ৷

এবারে সূরা নিসার ৮২ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক ৷ এ আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাত্‍ "তবে কি তারা কোরআন সম্পর্কে চিন্তা করে না? কোরআন যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো হত, তবে তারা এর মধ্যে বহু অসঙ্গতি বা ভুল খুঁজে পেত ৷"

ইসলাম বিরোধীরা মহানবীর অকাট্য যুক্তির মোকাবেলায় কোন যুক্তি দেখাতে না পেরে তার সম্পর্কে বিভিন্ন অপবাদ প্রচার করতো ৷ যেমন তারা বলতো, পবিত্র কোরআন মোহাম্মদেরই চিন্তার ফসল অথবা অন্যদের কাছে শিখেই মোহাম্মদ এসব কথা বলছে ৷ এই অপবাদের জবাবে আল্লাহ এ আয়াত নাজেল করেন ৷ এতে বলা হয়েছে, তারা কেন কোরআন সম্পর্কে চিন্তা করছে না? বিভিন্ন যুদ্ধ, পরিস্থিতি ও ঘটনা উপলক্ষ্যে ২০ বছরেরও বেশী সময়ে অবতীর্ণ হওয়া কোরআনের বাণীগুলো যদি মোহাম্মদেরই কথা হত, তাহলে এতে বিভিন্ন ধরণের অনেক অমিল বা ভুল দেখা যেত ৷ অর্থাত্‍ বিষয়বস্তু বা তথ্য গঠন বা বাক্যরীতির দিক থেকে এতে অনেক ভুল দেখা যেত ৷ কিন্তু এসব ক্ষেত্রেই কোরআনের সম্পূর্ণ নির্ভুলতা এর অন্যতম অলৌকিকত্বেরই প্রমাণ ৷ কারণ শক্তিশালী লেখকেরও আজকের এবং ২০ বছর পরের লেখায় পার্থক্য দেখা যায় ৷ লেখকদের লেখা প্রায়ই পরিবর্তনশীল ৷ এই আয়াতে শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে,

প্রথমতঃ অনেকেই ইসলাম ধর্মকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বিরোধী মনে করেন ৷ অথচ এ আয়াতে স্পষ্টভাবে আল্লাহর আয়াত সম্পর্কে চিন্তা ও গবেষণা করতে বলা হয়েছে, যাতে এর মাধ্যমে ইসলাম ধর্মের সত্যতা বোঝা সম্ভব হয় ৷
দ্বিতীয়তঃ পবিত্র কোরআন সব যুগের ও সব প্রজন্মের জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ ৷ পবিত্র কোরআন সম্পর্কে চিন্তা ও গবেষণা করা সব মুমিনেরই দায়িত্ব ৷
তৃতীয়তঃ যদি সমস্ত মানুষ পবিত্র কোরআনকে সত্য বলে মেনে নিত, তাহলে মানবজাতির মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধের অস্তিত্ব থাকতো না ৷ কারণ পবিত্র কোরআনে মতভেদ বা দ্বন্দ্ব সৃষ্টির মত কোন বক্তব্য বা সাংঘর্ষিক কোন কথা নেই ৷ #
 

কোরআনের আলো

( ১৩4 তম পর্ব)

 
কোরআনের আলোর এ পর্বে আমরা সূরা নিসার ৮৩ নম্বর আয়াত দিয়ে আলোচনা শুরু করবো ৷ এ আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাত্‍ "মোনাফিকদের কাজের ধরন হলো, যখনই শান্তি ও নিরাপত্তা এবং পরাজয় বা ভয়ের কোন সংবাদ তাদের কাছে পৌছে তখনই তারা তা রটনা করে, অথচ যদি তারা রাসুলের কাছে কিংবা নেতৃস্থানীয় মুসলমানদের কাছে এসব সংবাদ পৌছে দিত, তাহলে বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ লোকেরা সংবাদগুলোর সত্যতা বুঝতে পারতো ৷ তোমাদের প্রতি যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা না হত, তাহলে তোমাদের অল্প ক'জন ছাড়া সবাই শয়তানের অনুসরণ করতে ৷"

আগের কয়েকটি আয়াতে ইসলামের প্রাথমিক যুগে মহানবী (সা:) ও মুসলমানদের সাথে মোনাফিকদের বিদ্বেষী আচরণ সম্পর্কে কথা বলা হয়েছে ৷ এই আয়াতেও মোনাফিকদের অন্য একটি অন্যায় আচরণের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বিভিন্ন গুজব রটনা করা বিশেষ করে যুদ্ধের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে গুজব রটনা ছিল মোনাফিকদের অন্যতম কাজ ৷ এ ধরণের গুজব প্রচারের ফলে অনেক সময় মানুষ অযথাই ভীত হয়ে পড়তো, অথবা অবাস্তব ধরনের নিরাপত্তা অনুভব অনুভব করতো বা অতিরিক্ত আশাবাদী হয়ে উঠতো ৷ এরপর ইসলামী সমাজের নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে জনগণকে একটি সামগ্রিক নির্দেশ দিয়ে বলা হচ্ছে, রাষ্ট্র সম্পর্কিত বিষয়ে মুসলিম জনগণের উচিত নেতৃবৃন্দের শরণাপন্ন হওয়া এবং গুজব জাতীয় সংবাদও তাদের কাছে পৌছে দেয়া যাতে তারা সঠিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে জনগণকে সত্য বা বাস্তবতা জানাতে পারেন ৷ এরপর এই আয়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে বলা হয়েছে, মোনাফিকদের এই পদ্ধতি মানুষকে খোদাদ্রোহীতা ও শয়তানের অনুসরণের দিকে টেনে নিচ্ছিল এবং আল্লাহর অনুগ্রহ ও মহানবী (সা:) এর পথ নির্দেশনা না থাকলে অধিকাংশ মানুষই পথভ্রষ্ট হতো ৷ অর্থাত্‍ যে কোন সংকট বা সমস্যার সময় তারা শয়তানের কূ-মন্ত্রণার শিকার হতো ৷ এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে,
প্রথমত: মানুষের মধ্যে গুজব ছড়ানো মোনাফিকদেরই কাজ ৷ তাই গুজব সম্পর্কে সাবধান থাকতে হবে ৷
দ্বিতীয়ত: মুসলমানদের সামরিক বিষয় সম্পর্কিত সংবাদ তাদের নেতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত ৷
তৃতীয়ত: শুধুমাত্র সুবিবেচক ও গভীর দৃষ্টির অধিকারী মানুষই সত্য উপলদ্ধি করতে পারে ৷ সাধারণ মানুষের উচিত তাদের অনুসরণ করা ৷

এবারে সূরা নিসার ৮৪ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক ৷ এ আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাত্‍ "হে নবী, আল্লাহর পথে যুদ্ধ করুন, মুমিনদেরকেও এ ব্যাপারে উত্‍সাহ দিন, আপনাকে শুধু নিজের কাজের জন্যই দায়ী করা হবে ৷ অচিরেই আল্লাহ কাফেরদের শক্তি সংযত করবেন ৷ আল্লাহ শক্তিতে প্রবল এবং শাস্তিদানে কঠোর ৷"

ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, ওহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের পর আবু সুফিয়ান পরবর্তী হামলার সময় নির্ধারণ করে ৷ নির্দিষ্ট সময়ে মহানবী (সা:)ও মুসলমানদেরকে অগ্রসর হবার নির্দেশ দিলেন ৷ কিন্তু ওহুদ যুদ্ধে পরাজয়ের তিক্ত স্মৃতির কারণে বহু মুসলমান এই নির্দেশ পালন করেনি ৷ আর এই পটভূমিতেই নাজেল হলো এ আয়াত ৷ এ আয়াতে রাসূল (সা:)কে বলা হলো, ‌'এমনকি কেউ না আসলেও আপনি সেনাবাহিনী সংঘবদ্ধ করা ও যুদ্ধ ক্ষেত্রে এগিয়ে যাবার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ৷ একই সাথে আপনি মুসলমানদেরকে জিহাদে অংশ নেয়ার আহ্বান জানানোর কাজও অব্যাহত রাখুন ৷ ' মহানবী(সা:)ও তাই করলেন ৷ অল্প সংখ্যক মুসলমানও তাঁর সাথে অগ্রসর হলেন ৷ কিন্তু নির্দিষ্ট যুদ্ধ ক্ষেত্রে শত্রু বাহিনী উপস্থিত হল না এবং কোন সংঘর্ষও হয়নি ৷ এভাবে মুসলমানদের উপর কাফেরদের আঘাত প্রতিরোধ করার খোদায়ী ওয়াদা বাস্তবায়িত হয়েছিল ৷ এই আয়াতে শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে,
প্রথমত: সংগ্রাম ও বিপদের সময় সমাজের নেতাকেই সবার আগে অগ্রসর হতে হবে ৷ এমনকি তিনি যদি এ পথে সম্পূর্ণ একাকীও হন, তাহলেও তাকে সংগ্রাম করতে হবে ৷ আর এ অবস্থায় আল্লাহর পক্ষ থেকেও তার কাছে সাহায্য পৌঁছবে ৷
দ্বিতীয়ত: নবীগণের দায়িত্ব হলো, জনগণের কাছে ধর্ম ও ধর্মীয় বিধানের দায়িত্ব পৌছে দেয়া ৷ তাদের উপর কিছু চাপিয়ে দেয়া নবীগণের দায়িত্ব নয় ৷
তৃতীয়ত: প্রত্যেকেই তার নিজের কাজের জন্য দায়ী ৷ এমনকি নবীগণও মানুষের কাজ কর্মের জন্য দায়ী নন ৷ নবীগণ শুধু তাদের নিজ দায়িত্বের ব্যাপারেই দায়ী ৷
চতুর্থত: খোদায়ী শক্তি সবচেয়ে বড়, অবশ্য এই শক্তির সাহায্য পাবার শর্ত হলো, মানুষকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে ৷

এবারে সূরা নিসার ৮৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক ৷ এই আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাত্‍ "যে কেউ ভালো কাজের সুপারিশ করবে, এর পুরস্কারে তার অংশ থাকবে ৷ আর যে মন্দ কাজের উত্‍সাহ দেয়, তাতেও অর্থাত্‍ ঐ কাজের শাস্তিতে তার অংশ থাকবে ৷ আল্লাহ সব কিছুর ওপর নজর রাখেন ৷"
আগের আয়াতে মুমিনদেরকে জিহাদের দিকে আহ্বানের ব্যাপারে মহানবী (সা:)কে দায়িত্বশীল বলে উল্লেখ করার পর এ আয়াতে একটি সার্বজনীন বিধানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে ৷ এতে বলা হয়েছে, শুধু মহানবী নয়, প্রত্যেকেই অন্যদেরকে ভালো কাজের দিকে আহ্বানের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং এ আহ্বান হতে হবে ভালো পন্থায় ৷ অবশ্য প্রত্যেকেই শুধু তার নিজ কাজের জন্যই দায়ী ৷ কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, সমাজের ভালো মন্দ বা অন্যদের ব্যাপারে উদাসীন থাকতে হবে ৷
ইসলাম ব্যক্তি কেন্দ্রীক ধর্ম নয় যে, সবাই শুধু নিজের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত থাকবে এবং অন্যদেরকে সত্যের দিকে আহ্বান করা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ব্যাপারে উদাসীন থাকবে ৷ সত্‍কাজের আদেশ দেয়া ও অসত্‍ কাজের ব্যাপারে নিষেধ করা প্রত্যেক মুসলমানেরই দায়িত্ব ৷ প্রত্যেকেরই উচিত নিজের জীবনে, পরিবারে, নিজ কর্মস্থলে, নিজ মহল্লায়  এবং নিজের আওতাভুক্ত এলাকায় এই দায়িত্ব পালন করা ৷ মানুষ শুধু নিজ কাজেরই পুরস্কার বা শাস্তি পাবে না, অন্যদের ভালো বা মন্দ কাজের উত্‍সাহদাতা হিসাবে তাদের পুরস্কার ও শাস্তিরও অংশ বিশেষ তার প্রাপ্য ৷ এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে,
প্রথমত: দু'জন মুসলমানের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টি, সমবায়, সমাজে ভালো কাজে সহায়তা করা, কাফেরদের সাথে যুদ্ধে মুসলমানদের সাহায্য করা-এসব হলো সত্‍কাজের কিছু দৃষ্টান্ত ৷
দ্বিতীয়ত: মানুষ স্থান ও সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় সব ভালো কাজে অংশ নেয়ার সুযোগ পায় না ৷ কিন্তু ঐসব ভালো কাজের ব্যাপারে উত্‍সাহ দিয়েও পুরস্কারের অংশ বিশেষ লাভ করতে পারে ৷ #

কোরআনের আলো

( ১৩5 তম পর্ব)

কোরআনের আলোর এ পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি ৷ সূরা নিসার ৮৬ ন&