![]()
|
|
|
কোরআনের আলো ( ৪১তম পর্ব ) কোরআনের আলোর এবারের পর্বে সূরা বাকারার ১৩৯ থেকে ১৪২ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো। প্রথমেই ১৩৯ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, “হে নবী, আপনি আহলে কিতাবদের বলুন, আল্লাহ সম্বন্ধে তোমরা কি আমাদের সাথে বিতর্ক করতে চাও? যখন তিনি আমাদের প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। আমাদের কর্ম আমাদের জন্য এবং তোমাদের কর্ম তোমাদের জন্য, আমরা তাঁর প্রতি অকপট।” দুঃখজনকভাবে কোন কোন ধর্মের অশিক্ষিত অনুসারীরা মনে করেন যে, তারা আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী এবং আল্লাহ শুধু তাদের নিয়েই ভাবেন ও তাদের জন্যই পথ-প্রদর্শন পাঠিয়েছেন। তাই তারা অন্যান্য নবী ও তাদের অনুসারীদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। অথচ আল্লাহর সাথে কোন গোষ্ঠীর বা বংশের আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। সবাই আল্লাহর কাছে সমান এবং একমাত্র যে বিষয়টি আল্লাহর সাথে মানুষের দূরত্ব ও নৈকট্য সৃষ্টি করে, তাহলো মানুষের কর্মকান্ড। আর প্রত্যেককেই তার কর্মফল ভোগ করতে হবে। অবশ্য আল্লাহর কাছে সেসব কাজই গ্রহণীয় হবে, যেসব কাজ আন্তরিকভাবে আল্লাহর জন্য সম্পন্ন করা হবে। এ ধরনের কাজ হলো প্রকৃত ঈমানের নিদর্শন এবং এসব কাজ সব ধরণের শির্কযুক্ত চিন্তাধারা। এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, মানুষের একাধিপত্যকামীতা কখনও এতদূর পর্যন্ত গড়ায় যে, এমনকি আল্লাহকেও পর্যন্ত শুধুমাত্র নিজেদের জন্যই চায়, অন্য কারো জন্য নয় এবং আল্লাহকে শুধু নিজেদের খোদা বলে মনে করে, অন্যদের নয়। অথচ আল্লাহ কোন ধর্ম, জাতি বা গোষ্ঠীর একক অধিকারভুক্ত নন। তিনি সমগ্র বিশ্ববাসীরই পালনকর্তা। এবারে সূরা বাকারার ১৪০ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, “হে আহলে কিতাব! তোমরা কি বলতে চাও ইব্রাহীম, ইসহাক, ইয়াকুব ও তার বংশধরগণ ইহুদী কিংবা খ্রীষ্টান ছিল? হে নবী, আহলে কিতাবদের বলুন, তোমরা কি বেশী জান , না আল্লাহ ? আল্লাহর নিকট হতে নবীদের বিষয়ে সাক্ষ্য-যা তাঁর কাছে আছে, তা যে গোপন করে, তা অপেক্ষা কে অধিক অত্যাচারী এবং তোমরা যা করছ, সে সম্পর্কে আল্লাহ বেখবর নন।” হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ) এর কোন কোন অনুসারী তাদের ধর্মের সত্যতা প্রমাণের জন্য এ দাবী করে যে স্বয়ং হযরত ইব্রাহীম ও তার পরবর্তীকালের নবীরাও ছিলেন, তাদের ধর্মের অনুসারী। কিন্তু হযরত ইব্রাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ), হযরত ঈসা (আঃ) ও পরবর্তীকালের নবীদের ইতিহাস অনুযায়ী এ ধরণের দাবীর পেছনে অন্যায় বিদ্বেষ ছাড়া ও জাতিগত বিদ্বেষ ছাড়া অন্য কোন যুক্তি নেই। পবিত্র কোরআন সত্যের বিকৃতিকে সবচেয়ে বড় অপরাধ বলে মনে করে। কারণ সত্যের বিকৃতি বহু যুগ ধরে বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং এর ফলে সমাজের বিকাশ ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি বাধাগ্রস্থ হয়। এবারে সূরা বাকারার ১৪১ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, “সেই একদল ছিল, নিশ্চয়ই যারা গত হয়েছে, তারা যা অর্জন করেছে তা তাদের জন্য এবং তোমরা যা অর্জন করেছ তা তোমাদের জন্য এবং তারা যা করে গেছে, সে সম্পর্কে তোমাদের জিজ্ঞাসা করা হবে না।” এই আয়াতে ইহুদী ও খ্রীষ্টানদের ভিত্তিহীন দাবীর জবাব দেয়া হয়েছে। এখানে প্রশ্ন করা হয়েছে যে, কেন তারা তাদের ইতিহাসকে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর যুগ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাচ্ছে? একটি জীবন্ত বা গতিশীল সমাজকে অবশ্যই নিজের কাজের ওপর নির্ভর করতে হবে, অতীত ইতিহাসের ওপর নয়। অতীতের সমস্ত নবী ও জাতি গত হয়ে গেছে। তাদের কর্ম তাদের সাথেই সম্পর্কিত। তেমনি ইহুদী ও নাসারা জাতিকেও তাদের কাজকর্মের জন্য নিজেদেরকেই জবাবদিহিতা করতে হবে। গুণাবলী হল অর্জন করার বিষয়। আর প্রত্যেক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে নিজের প্রচেষ্টার মাধ্যমে তা অর্জন করতে হয়। গুণাবলী উত্তরাধিকারের মত কোন বিষয় নয় যে তা সন্তানরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে লাভ করবে। এবারে সূরা বাকারার ১৪২ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, “নির্বোধ লোকগুলো বলবে, কিসে তাদেরকে তাদের কেবলা হতে ফিরিয়ে দিল, যার দিকে তারা ছিল। বল, পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই, তিনি যাকে ইচ্ছা সরল পথে পরিচালিত করেন।” এর আগে আমরা বলেছিলাম, মুসলমানদের বিরোধীতা করার ক্ষেত্রে ইহুদীদের অন্যতম অজুহাত ছিল বায়তুল মোকাদ্দাসের পরিবর্তে কাবা শরীফকে কিবলা করা। এই আয়াতে ও পরবর্তী কয়েকটি আয়াতে এ বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট আলোচনা এবং ইহুদীদের আপত্তির জবাব দেয়া হয়েছে। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) নবুওত লাভের পর মক্কায় থাকাকালীন সময়ে অর্থাৎ দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে মুখ রেখে নামাজ পড়তেন। কারণ- প্রথমত : আল্লাহর সমস্ত উপাসকদের কেবলা ছিল বায়তুল মোকাদ্দাস এবং সমস্ত ঐশী ধর্মের কাছেই বায়তুল মোকাদ্দাস ছিল সম্মানিত স্থান। দ্বিতীয়ত : মুশরিকরা কাবা ঘরকে মূর্তির ঘরে রূপান্তরিত করেছিল। এ অবস্থায় ইসলামের নবী (সাঃ) যদি কাবা ঘরের দিকে মুখ করে নামাজ পড়তেন, তাহলে বাস্তবে তা হতো মূর্তিদের দিকে মুখ ফেরানো। মদীনায় হিজরত করার পরও কয়েক মাস পর্যন্ত মুসলমানরা বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামাজ পড়তেন। আর ইহুদীরা এ বিষয়কে অজুহাত করে বলতো, তোমরা মুসলমানরা আমাদের অনুসারী। তোমাদের কোন স্বাধীনতা নেই-কারণ তোমাদের কোন স্বতন্ত্র কেবলা নেই। এ নিয়ে উপহাস ও বিদ্রুপ মুসলমানদের জন্য অসহনীয় ছিল। এ অবস্থায় আল্লাহ কেবলা পরিবর্তনের নির্দেশ দিলেন। একদিন রাসূল (সাঃ) যখন মসজিদে জোহরের নামাজ আদায় করছিলেন, তখন জিব্রাইল ফেরেশতার প্রতি নির্দেশ দেয়া হলো, নামাজের মধ্যেই রাসূল (সাঃ)কে যেন কাবামুখী করা হয়। সেই থেকে ঐ মসজিদ জু-কেবলাতিন অর্থাৎ দুই কেবলার অধিকারী মসজিদ হিসাবেই খ্যাতি লাভ করে। কিন্তু বাহানাবাজ ইহুদীরা এবার নতুন আপত্তি তুলে মুসলমানদেরকে বললো, যদি আগের কেবলা সঠিক হয়, তাহলে কোন কারণে তা বাতিল করা হলো? এবং কেন এতকাল পর্যন্ত বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে মুখ রেখে নামাজ পড়া হলো? পবিত্র কোরআনে এর জবাবে বলা হলো, কেবলার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ স্থান বা কোন অঞ্চল নিয়ে আছেন বা আল্লাহ পশ্চিম দিকে আছেন বা পূর্ব দিকে আছেন। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ পূর্ব-পশ্চিম সব দিকেই আছেন এবং সবই তার মালিকানাধীন। আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া কোন স্থানেরই বিশেষ কোন মর্যাদা নেই। আল্লাহর নির্দেশেই আমরা কোন বিশেষ স্থানকে সম্মান করি। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আল্লাহর নির্দেশের অনুগত হওয়া। আল্লাহ যেদিকেই মুখ ফেরানোর নির্দেশ দেন, সেদিকেই আমাদের মুখ ফেরানো উচিত-তা কাবাই হোক বা বায়তুল মোকাদ্দাস হোক। তারাই আল্লাহর সহজ ও সঠিক পথে পরিচালিত হবে, যারা আল্লাহর নির্দেশের আনুগত্য করবে। যা-ই তাকে বলা হবে কোন প্রশ্ন ছাড়াই তা মেনে নিতে হবে। নিজের ইচ্ছার সাথে যা সঙ্গতিপূর্ণ শুধু তা-ই গ্রহণ করা ও এছাড়া অন্য কিছুকে প্রশ্নের সম্মুখীন করা আল্লাহর আনুগত্যের পরিচয় নয়। এবারে এ আয়াতগুলোর শিক্ষণীয় বিষয়গুলো তুলে ধরা যাক। প্রথমতঃ আল্লাহ সমস্ত মানুষের এবং সব কিছুরই আল্লাহ। তিনি কোন বিশেষ ধর্ম বা জাতির একক খোদা নন। কোন ব্যাক্তি বা গোষ্ঠী তার কাছে বিশেষ সুবিধা প্রাপ্ত নন। শুধুমাত্র মানুষের নিজের কাজই তাকে আল্লাহর কাছে বা দূরে সরিয়ে নেয়। দ্বিতীয়তঃ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ঘটনা বিকৃত করা মানব প্রজন্মের প্রতি সাংস্কৃতিক জুলুম। পবিত্র কোরআনে এই অত্যাচারকে বৃহত্তম অত্যাচার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তৃতীয়তঃ নিজের অবদান বা কাজ নিয়ে চিন্তা করা উচিত। অতীতের পূর্ব পুরুষদের নিয়ে গর্ব অহঙ্কার করার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই। কারণ তাদের ভালো কাজের জন্য আমরা যেমন কোন পুরস্কার পাব না, তেমনি তাদের অন্যায়ের জন্যেও আমরা শাস্তিও পাব না। চতুর্থতঃ আল্লাহ যেদিকে ফিরে ইবাদত করার নির্দেশ দিবেন সেদিকেই কেবলা করবো। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ সেদিকেই আছেন। তাই অতীতে বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে ফিরে ইবাদত করা ও পরে কাবার দিকে ফিরে ইবাদত করার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কারণ আল্লাহর নির্দেশেই এ দুই স্থানকে কেবলা করা হয়েছে-আমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী নয়। # কোরআনের আলো ( ৪২তম পর্ব ) কোরআনের আলোর এবারের পর্বে সূরা বাকারার ১৪৩ থেকে ১৪৭ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা যাক। ১৪৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “এভাবেই তোমাদেরকে মধ্যপন্থী এক আদর্শ জাতিরুপে প্রতিষ্ঠিত করেছি, যাতে তোমরা মানব জাতির জন্য সাক্ষী স্বরুপ হতে পার এবং রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হতে পারে। (হে রাসূল) তুমি এ যাবত যে কেবলা অনুসরণ করেছিলে, তাকে এই উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম-যাতে জানতে পারি কে রাসূলের অনুসরণ করে এবং কে ফিরে যায়। আল্লাহ যাদের সৎ পথে পরিচালিত করেছেন তারা ব্যতীত অপরের নিকট তা নিশ্চয় কঠিন। আল্লাহ এরূপ নন যে তোমাদের বিশ্বাসকে ব্যর্থ করেন। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি স্নেহশীল দয়াময়। ” গত পর্বে কেবলা পরিবর্তন সম্পর্কে ইহুদীদের আপত্তিগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তখন আপনারা জেনেছেন যে, আল্লাহ কিভাবে এসব আপত্তির জবাব দিয়েছেন। আল্লাহ এ আপত্তির জবাবে বলেছেন, পূর্ব পশ্চিম আল্লাহরই মালিকানাধীন। আল্লাহর নির্দেশিত সরল পথে চলার মধ্যেই রয়েছে মুক্তি বা সুপথ। এমনটি ভাবার কোন কারণ নেই যে আল্লাহ পূর্বে অথবা পশ্চিমে বিরাজ করছেন এবং শুধু সেদিকেই মুখ ফেরাতে হবে। এই আয়াতে মুসলিম জাতিকে সব ধরণের চরম পন্থা থেকে মুক্ত মধ্যপন্থী জাতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মুসলিম জাতি জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে বস্তুগত,অর্থনৈতিক, আধ্যাত্মিক, বিশ্বাসগত প্রভৃতি সব ক্ষেত্রেই ভারসাম্যের সীমানার মধ্যে রয়েছে। এ আদর্শ সমগ্র মানবজাতির জন্য উপযোগী। এটা স্পষ্ট সমস্ত মুসলমান এরকম নয় এবং মুসলমানদের অনেকেই চিন্তা অথবা কাজে চরমপন্থা বা বাড়াবাড়ির মধ্যে রয়েছে। তাহলে এ আয়াতের মূল উদ্দেশ্য কি? এই আয়াতের মূল উদ্দেশ্য হলো এটা বোঝানো যে ইসলামী বিধান বা ধর্ম একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যপন্থী ধর্ম। কেউ যদি ইসলামের সমস্ত বিধান মেনে চলে, তাহলে একমাত্র সেই এমন অবস্থানে উপনীত হবে যে আল্লাহ তাকে মানুষের জন্য তার নিজের সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করবেন। যেমনটি রাসূল (সাঃ)এর আহলে বাইতগণ ঐশী নির্দেশনাবলীর প্রথম বাস্তবায়নকারী ও বিশেষজ্ঞ ছিলেন এবং সত্যিকারের মুসলিম জাতির পূর্ণাঙ্গ সাক্ষী বা আদর্শ ছিলেন। তারা বলেছেন, মধ্যপন্থী জাতি বলে আল্লাহ যাদেরকে মানুষের ওপর তার নিজের সাক্ষী বলে ঘোষণা করেছেন, আমরাই হলাম সেই জাতি। এই আয়াতের পরবর্তী অংশে অন্য যে গুরুত্বপূর্ণ দিকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তাহলো কেবলা পরিবর্তনের নির্দেশ আল্লাহর অন্যান্য নির্দেশের মতই একটি নির্দেশ ও পরীক্ষা-যাতে এটা জানা যায় যে কারা আল্লাহর অনুগত এবং কারা নিজেদের প্রবৃত্তির অনুগত। আর এ জন্যেই যারা আল্লাহর পথ নির্দেশনা বা হেদায়াত থেকে বঞ্চিত তাদের জন্য এ নির্দেশ পালন করা কঠিন এবং তারা এ ক্ষেত্রে আপত্তি ও প্রশ্ন তুলছে। এবারে সূরা বাকারার ১৪৪ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, “হে নবী, ঐশী নির্দেশের অপোয় বার বার আকাশের দিকে তোমার তাকানোকে লক্ষ্য করছি। সুতরাং আমি তোমাকে সেই কেবলামুখী করব যা তুমি ইচ্ছে কর। অতএব তুমি পবিত্রতম মসজিদের দিকে তোমার মুখ ফেরাও। হে মুসলমানরা, তোমরা যেখানেই থাক না কেন সেদিকে মুখ ফেরাও এবং যাদের কিতাব দেয়া হয়েছে তারা নিশ্চিতভাবে জানে যে এটা তাদের প্রতিপালকের সত্য। তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ বেখবর নন।” ইহুদীরা যখন মুসলমানদের এই বলে বিদ্রুপ করছিল যে তাদের কোন স্বতন্ত্র কেবলা নেই, তখন হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) কেবলা পরিবর্তনের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। হঠাৎ জোহরের নামাজের সময় আল্লাহর রাসূলের ওপর এ নির্দেশ অবতীর্ণ হয় এবং রাসূল (সাঃ) বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে মুখ ফিরিয়ে মক্কার দিকে মুখ করায় তার পেছনে জামাতে সমবেত মুসলমানরাও কাবামুখী হয়। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো পূর্ববর্তী ঐশী গ্রন্থে একথা উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসলামের নবী দুই কেবলার দিকে মুখ করে নামাজ পড়বেন এবং ইসলামের নবীর অন্যতম এক নিদর্শন হবে এই ঘটনা। তাই এই আয়াতে আহলে কিতাবদের হুঁশিয়ার করে বলা হয়েছে তোমরাই যখন জান যে এই নির্দেশ সত্য তবুও কেন প্রতিবাদ করছ? এবারে সূরা বাকারার ১৪৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, “হে নবী জেনে রাখুন যাদের গ্রন্থ দেয়া হয়েছে আপনি যদি তাদের কাছে সমস্ত দলীল পেশ করেন তবুও তারা আপনার কেবলার অনুসারী হবে না এবং আপনিও তাদের কেবলার অনুসারী নন এবং যেমনটি তাদের কেউ কেউ অন্য কারো কেবলার অনুসারী হবে না। আপনার কাছে জ্ঞান আসার পরও আপনি যদি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করেন, তবে নিশ্চয়ই আপনি হবেন অত্যাচারীদের অন্তর্ভূক্ত।” এই আয়াতে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)কে সান্ত্বনা দিয়ে বলা হচ্ছে-যদি আহলে কিতাব আপনার কেবলাকে গ্রহণ না করে, তবে আপনি দুঃখিত হবেন না। কারণ হিংসা তাদেরকে সত্য গ্রহণের সুযোগ দেবে না। তাই আপনি যত যুক্তিই দেখান না কেন, তারা কিছুতেই যুক্তি গ্রহণ করবে না। কিন্তু তারা গ্রহণ না করলেও আপনি যেন আপনার কেবলা সম্পর্কে নীরব না হন বরং দৃঢ়তার সাথে এটা ঘোষণা করবেন যে, আমরা এসব হৈ-চৈ বা আপত্তিতে নত হব না এবং আমাদের অবস্থান থেকে মোটেই পিছু হটবো না। ইসলাম ধর্মে সবার জন্য একই বিধান থাকায় আল্লাহ তার নবীকেও হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, এমন কি যদি তুমিও তাদের প্রতি আকৃষ্ট হতে চাও এবং নিজের সঠিক কেবলার অনুসারী না হও তাহলে তুমিও নিজের উম্মতের ওপর বড় ধরণের জুলুম করার দোষে দোষী হবে। এবারে সূরা বাকারার ১৪৬ ও ১৪৭ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ দুটি আয়াতে বলা হয়েছে, “আমি যাদেরকে গ্রন্থ দিয়েছি, তারা তাকে সেরূপ জানে, যেরূপ জানে আপন সন্তানগণকে এবং তাদের একদল জেনে শুনে সত্যকে গোপন করে। সত্য তোমার প্রতিপালকের, সুতরাং তুমি সন্দিহানদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” তাওরাত ও ইঞ্জিল গ্রন্থে শেষ নবীর বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে। আর তাই আহলে কিতাবগণ নবী (সাঃ) কে চিনতো কিন্তু বিদ্বেষ ও এক গুঁয়েমীর কারণে তারা এই সত্যকে অন্যদের কাছে গোপন রাখতো বা সত্যকে বিকৃত করতো। অবশ্য আহলে কিতাব রাসূল (সাঃ) এর বৈশিষ্ট্য দেখে তার প্রতি ঈমান এনেছিল। এইসব শারীরিক ও আত্মিক বৈশিষ্ট্য পূর্ববর্তী গ্রন্থে এমনভাবে উল্লেখিত হয়েছিল যে কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী তারা নবী (সাঃ)কে নিজের সন্তানের মতই চিনতো। শেষের এই আয়াতে যে বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে জোর দেয়া হয়েছে তা হলো, আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নাজেল হয়েছে একমাত্র তাই সত্য। মানুষের বিরোধিতা এমনকি অধ |