কোরআনের আলো

( সূরা হুদ- পর্ব : ২১ )

পাঠক! কোরআনের আলোর এ পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। এবারে আমরা সূরা হুদের ৮৭ থেকে ৮৯ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো। প্রথমেই ৮৭ নম্বর আয়াত নিয়ে

আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ "(হযরত শোয়াইব (আঃ)এর জবাবে মাদিয়ানবাসীরা বললো) তোমার নামাজ কি তোমাকে নির্দেশ দেয় যে, আমাদের পিতৃপুরুষেরা যার উপাসনা করতো আমাদের তা বর্জন করতে হবে এবং আমরা ধন সম্পদ সম্পর্কে যা খুশী তা করতে পারবো না? নিশ্চয়ই তুমি সহিষ্ণু ও সদাচারী।"

এর আগের পর্বে ৮৪ থেকে ৮৬ নম্বর আয়াতের উপর আলোচনায় বিস্তারিত বলা হয়েছে, হযরত শোয়াইব (আঃ) মাদিয়ানবাসীকে হালাল-হারাম মেনে চলার এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অন্যকে না ঠকানোর ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি জনগণকে বলেছিলেন, হারাম উপায়ে অর্থাৎ অসৎভাবে উপার্জিত অঢেল সম্পদের চেয়ে বৈধ পন্থায় অর্জিত অল্প সম্পদই শ্রেয়। কাজেই লেনদেনের সময় অন্যকে যে কোন উপায়ে ঠকানো বা ওজনে কম দেয়া অত্যন্ত গর্হিত কাজ। কিন্তু দু:খজনক ব্যাপার হলো, মাদিয়ানবাসী আল্লাহর নবীর উপদেশ এবং সাবধানবাণীতে কর্ণপাত করলো না বরং উল্টো তারা বলতে লাগলো, হে শোয়াইব! আপনাকে আমরা একজন বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তি হিসাবেই জানি। তাই আপনার কাছ থেকে এ ধরণের অদ্ভুত কথা আমাদের প্রত্যাশিত নয়। আপনি কি চান আমরা আমাদের সম্পদ যথেচ্ছ ব্যবহার না করি এবং আমরা পূর্ব পুরুষদের ধ্যান-ধারনা পরিত্যাগ করি?

এবারে সূরা হুদের ৮৮ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ " হযরত শোয়াইব (আঃ) বললেন, হে আমার সম্প্রদায়! আমি যদি আমার প্রতিপালক প্রেরিত স্পষ্ট নিদর্শনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকি এবং তিনি যদি তাঁর নিকট হতে আমাকে উৎকৃষ্ট জীবনোপকরণ দান করে থাকেন তবে কি করে আমি আমার কর্তব্য হতে বিরত থাকবো? আমি তোমাদেরকে যা নিষেধ করি আমি নিজে তা করতে চাই না। আমি আমার সাধ্যমত সংস্কার করতে চাই, আমার কার্যসাধন তো আল্লাহরই সাহায্যে। আমি তারই উপর নির্ভর করি এবং আমি তারই অভিমুখী।"

মাদিয়ানবাসীর আচরণের জবাবে হযরত শোয়াইব (আঃ) বললেন, আমি তোমাদেরকে সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহারের ব্যাপারে বারণ করেছি তোমাদেরকে সংশোধন করতে এবং তোমাদের অরক্ষিত সমাজকে সংস্কার করার উদ্দেশ্যে, হিংসা বা সংকীর্ণতার বশবর্তী হয়ে নয়। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ আমাকে প্রেরণ করেছেন সুস্পষ্ট যুক্তির মাধ্যমে তোমাদেরকে পথ প্রদর্শনের জন্যে। আমি আমার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে একমাত্র তাঁরই উপর নির্ভর করি এবং তাঁরই প্রদর্শিত পথে পদক্ষেপ গ্রহণ করি, তোমরা গ্রহণ কর আর নাই বা কর।  আমি কখনো আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করবো না।

পয়গম্বরদের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজ ও মানুষকে পরিশুদ্ধ করা, তারা আল্লাহর নির্দেশেই কাজ করেন, তার সন্তুষ্টিই পয়গম্বরদের একমাত্র কামনা। মানুষের উচিত পয়গম্বরদের প্রদর্শিত পথ অবলম্বন করা কারণ এ পথেই রয়েছে ইহ ও পরকালের কল্যাণ ও মুক্তি।

এবারে সূরা হুদের ৮৯ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ "হে আমার জাতি! আমার সাথে জিদ করে তোমরা নুহ, হুদ বা সালেহ(আঃ)এর সম্প্রদায়ের মত নিজেদের উপর ঐশী শাস্তি ডেকে আনবে না, আর লুতের জাতিতো তোমাদের থেকে খুব দূরে নয়।" হযরত শোয়াইব (আঃ) তার সম্প্রদায়ের মানুষকে সত্য ও একত্ববাদের প্রতি আহ্বানের পর তাদেরকে সতর্ক করে দেন এবং অতীত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়ার কথা বললেন। তিনি লুত (আঃ)এর জাতির পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, এ ঘটনা তো আর অনেক পুরানো কোন ঘটনা নয়। নবী-রাসূলদের কথা অমান্য করার কি যে পরিণতি তা হযরত নূহ,  হযরত হুদ, হযরত সালেহ (আঃ)এর জাতির ভাগ্যে যা ঘটেছে তা থেকেই উপলদ্ধি করা যায়। মানব ইতিহাসে যুগে যুগে সংঘটিত সকল ঘটনাই মানুষের জন্য শিক্ষণীয়। মানুষের উচিত অতীত ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। আল্লাহর নির্দেশ অমান্যকারী ব্যক্তি বা জাতি এ জগতেই কোন না কোন উপায়ে প্রায়শ্চিত্য ভোগ করেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে অধঃপতিত গোটা জাতিই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।#  


কোরআনের আলো

( সূরা হুদ- পর্ব : ২২ )

পাঠক! কোরআনের আলোর এ পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। পবিত্র কোরআন অধ্যয়ন ও এর নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে মানুষ নিজেকে বিভ্রান্তির চোরাবালী থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে। তাই আল্লাহর রাসূল ও পবিত্র ইমামগণ মুসলমানদেরকে সব সময় কোরআনের সান্নিধ্যে থাকার উপদেশ দিয়েছেন। এ সম্পর্কে  রাসূলে খোদা (সাঃ) বলেছেন, "তোমরা কোরআন অধ্যয়ন করবে, সর্বক্ষণ তা মেনে চলবে এবং কখনো কোরআন থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। কোরআনকে অতিরঞ্জিত করবে না, একে উপার্জনের ও প্রতিষ্ঠার উপাদানে পরিণত করবে না।"

প্রিয় পাঠক! এই হাদীস শরীফের মর্মার্থের প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে শুরু করছি মূল আলোচনা। এবারের পর্বে আমরা সূরা হুদের ৯০ থেকে ৯৫ নম্বর আয়াত পর্যন্ত আলোচনা করবো। প্রথমেই ৯০ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ "তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর ও তার দিকে প্রত্যাবর্তন কর, নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক পরম দয়ালু ও প্রেমময়।"

হযরত শোয়াইব (আঃ) ও মাদিয়ানবাসীদের কার্যকলাপ সম্পর্কে আগে কয়েকটি আয়াতে বলা হয়েছে, যা আমরা গত দুই আসরে আলোচনা করেছি। মাদিয়ানবাসী হযরত শোয়াইব (আঃ) আহ্বানে সাড়া না দিয়ে বরং আল্লাহর নবীর বিরুদ্ধাচরণে লিপ্ত হয়েছিল। কিন্তু হযরত শোয়াইব (আঃ)এর মনে নবী হিসাবে মানুষের প্রতি  মমত্ব ও ভালোবাসা ছিল, ফলে তিনি মাদিয়ানবাসীর অনাকাঙ্খিত আচরণে অসহিষ্ণুতা হলেন না। তিনি তাদের বিশ্বাস ও কার্যকলাপের পরিণতির ব্যাখ্যা দিলেন এবং তাদেরকে সতর্ক করলেন। ৯০ নম্বর আয়াতেও আমরা দেখতে পাচ্ছি হযরত শোয়াইব (আঃ) তাদেরকে অনুশোচিত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং সৃষ্টিকর্তার আদেশ মেনে নেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি তাদেরকে উৎসাহ দিয়ে এটাও বলেছেন যে, আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু এবং তিনি মানুষকে খুব ভালোবাসেন।

হ্যাঁ, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অনুতপ্ত ক্ষমা প্রার্থীকে শুধু ক্ষমাই করেন না তিনি তাওবাকারী অনুশোচিত বান্দাকে অত্যন্ত ভালোবাসেন।

এবারে সূরা হুদের ৯১ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ "তারা বললো, হে শোয়াইব আপনি যা বলেছেন, তার অনেক কথাই আমরা বুঝিনা এবং আমরা তো আপনাকে আমাদের মধ্যে দুর্বল ব্যক্তিরূপে মনে করি। স্বজনবর্গ না থাকলে আমরা আপনাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করতাম, আমাদের দৃষ্টিতে আপনি কোন মর্যাদাবান ব্যক্তি নন।"

মাদিয়ানবাসীদের প্রতি হযরত শোয়াইব (আঃ) এর বিনত উপদেশ কোন কাজে আসলো না। তারা আল্লাহর নবীর বিনয়কে দুর্বলতা ভেবে বসলো, তারা হযরত শোয়াইব (আঃ)এর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে ঔদ্ধত্য হয়ে উঠলো এবং তাকে হত্যার হুমকি দিল। পয়গম্বরের কথা সুস্পষ্ট ও যু্ক্তিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তারা তাচ্ছিল্যের সাথে বলতে লাগলো, হযরত শোয়াইব কি বলতে চায় তা আমাদের বোধগম্য নয়। তারা হযরত শোয়াইব (আঃ)কে অত্যন্ত দুর্বল মনে করলো এবং আল্লাহর এই নবীর সাথে তাদের আচরণ হয়ে উঠলো অত্যন্ত অপমানজনক। ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে নবী রাসুলদেরকে সবচেয়ে বেশী অপমান ও কটুক্তি সহ্য করতে হয়েছে। সত্য বিমুখ বিরুদ্ধবাদীদের কোন যুক্তি ছিল না। হত্যা, নির্যাতন ও কটুক্তি ছিল তাদের হাতিয়ার।

এবারে ৯২ ও ৯৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই দুটি আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ "শোয়াইব বললেন, হে আমার জাতি! তোমাদের নিকট আমার স্বজনবর্গ আল্লাহর চেয়ে বেশী প্রিয়? আর এজন্যই কি তাকে বিস্মৃত হয়ে পেছনে ফেলে রেখেছ ? নিশ্চয় তোমাদের কার্যকলাপ আমার প্রতিপালকের আয়ত্বে রয়েছে। হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যেমন করছো করে যাও, আমিও আমার কাজ করছি। তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে কার উপর আসবে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি এবং কে মিথ্যাবাদী। সুতরাং তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষা করছি।"

কাফের ও বিরুদ্ধবাদীদের কঠোর মনোভাবের কারণে হযরত শোয়াইব (আঃ) যখন নিশ্চিত হলেন যে এই জাতি কখনও সত্যকে গ্রহণ করবে না, তখন তিনি অবাধ্য জাতিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ''তোমাদের যা খুশী তাই করতে থাক আমিও আমার পথে চলছি। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই প্রমাণিত হবে কারা সত্য পথে রয়েছে। তবে এটা মনে রেখ আমি আমার স্বজন পরিজনের উপর নির্ভর করি না যে তাদের খাতিরে তোমরা আমার অনিষ্ট করবে না। আমি একমাত্র বিশ্ব শ্রষ্টা আল্লাহর উপর নির্ভর করি, যিনি তোমাদের অবস্থা সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত।''  

এবারে এই সূরার ৯৪ ও ৯৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ দুই আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ "যখন আমার নির্দেশ এল তখন আমি শোয়াইব ও তার সঙ্গী ঈমানদারগণকে নিজ রহমতে রক্ষা করি, অত:পর যারা সীমালঙ্ঘন করেছিল মহানাদ তাদেরকে আঘাত করলো। ফলে তারা নিজ নিজ গৃহে নতজানু অবস্থায় শেষ হয়ে গেল,  যেন তারা সেখানে কখনোই বসবাস করেনি। জেনে রাখ ধ্বংসই ছিল মাদিয়ানবাসীদের পরিণাম যেভাবে ধ্বংস হয়েছিল সামুদ সম্প্রদায়।"  

মাদিয়ানবাসীও শেষ পর্যন্ত অন্যান্য ঔদ্ধত্য ও অবাধ্য জাতির মত একই পরিণতির স্বীকার হয়েছিল। তারা আল্লাহর রোষানলে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। যারা আল্লাহর অফুরন্ত নেয়ামত বা কল্যাণের কৃতজ্ঞতা স্বীকারের পরিবর্তে তা অস্বীকার করে তাদের মৃত্যুও হয় মর্মন্তুদভাবে। তাদের মৃত্যু সংঘটনে সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে কোন দয়া বা অনুগ্রহের স্পর্শ থাকে না।# ( আপডেট : ২০ ডিসেম্বর-২০০৭)


কোরআনের আলো

( সূরা হুদ- পর্ব : ২৩ )

কোরআনের আলোর এ পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। এবারে আমরা সূর হুদের ১১১ থেকে ১১৫ নম্বর আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা উপস্থাপন করবো। ১১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ "যখন সময় আসবে তখন অবশ্যই তোমার প্রতিপালক তাদের প্রত্যেককে তার কর্মফল পুরোপুরিভাবেই দেবেন, তারা যা করে নিশ্চয়ই তিনি সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।"

আল্লাহর বিধানে পুরস্কার ও শাস্তি এ দুটোর ব্যবস্থাই রাখা হয়েছে। মানুষের কৃতকর্মের ভিত্তিতে পুরস্কার ও শাস্তির বিষয়টি নির্ধারিত হবে। সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর কাছে মানুষের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল কর্মই স্পষ্ট, কোন কিছুই তার কাছে গোপন নেই। মানুষের মনের সুপ্ত অভিপ্রায় সম্পর্কেও তিনি অবগত। সব কিছুর উপর তার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। কাজেই শাস্তি ও পুরস্কার দেয়ার ব্যাপারে তিনিই পূর্ণাঙ্গ ন্যায় ও সমতা রক্ষা করতে সক্ষম। তবে এই প্রতিদান দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে মূলত পরকালের জন্য। কিন্তু বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই ইহজগতেই প্রতিদানের কিছু অংশ দিয়ে থাকেন। ইসলাম মনে করে মানুষ তার সকল কাজেরই প্রতিফল লাভ করবে। কোন কাজই বৃথা যাবে না। ভালো কাজের যেমন পুরস্কার রয়েছে তেমনি মন্দ কাজের শাস্তিও অনিবার্য। এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোন সুযোগ নেই। প্রতিদানের ক্ষেত্রে আল্লাহর বিচার অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত। তিনি কারো উপর জুলুম করেন না, কারো প্রতিদানে কম বেশীও করা হবে না। এই আয়াতে এই বিষয়টিই ইঙ্গিত করা হয়েছে।

এবারে এই সূরার ১১২ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ "সুতরাং(হে পয়গম্বর) তুমি ও তোমার সঙ্গে যারা আল্লাহর পথে এসেছে, সবাই যেভাবে তুমি আদিষ্ট হয়েছো সেভাবেই স্থির থাকো এবং সীমালঙ্ঘন করো না। তোমরা যা কর নিশ্চয়ই তিনি তার দ্রষ্টা।"

এই আয়াতে আল্লাহতালা মুমেন বিশ্বাসীদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, বিরুদ্ধবাদীদের আচরণ যেন তাদের মনে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে এবং নিজের মত বিশ্বাসের উপর স্থির ও অবিচল থাকতে হবে। এর পাশাপাশি বিরুদ্ধবাদীদের ব্যাপারে পদপে গ্রহণের ক্ষেত্রে কখনো আল্লাহর দেয়া সীমারেখা অতিক্রম করা যাবে না। নবী করিম (সাঃ) বলেছেন, সূরায়ে হুদ আমাকে বৃদ্ধ করে ফেলেছে, এই আয়াতের কারণেই আল্লাহর রাসূল এই মন্তব্য করেছিলেন। এখানে যেমন পয়গম্বরকে ধৈর্য্য ও প্রতিরোধের কথা বলা হয়েছে তেমনি মুমেন বিশ্বাসীদেরকে স্থীর অবিচল থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে খোদাদ্রোহী শক্তির অনুপ্রেরণায় নিজের আদর্শের ব্যাপারে যেমন অমনোযোগী বা আপোষকামী হওয়া যাবে না, তেমনি প্রতিপরে বিরুদ্ধে সীমালঙ্ঘন বা বাড়াবাড়িও করা যাবে না। প্রতিরোধ ও ভারসাম্যমূলক অবস্থান হচ্ছে ইসলামের শিক্ষা।

যাই হোক এবার সূরা হুদের ১১৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ "যারা সীমা লঙ্ঘন করেছে তাদের প্রতি ঝুকে পড়ো না-তাহলে অগ্নি (বা নরক) তোমাদেরকে স্পর্শ করবে, এ অবস্থায় আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের কোন অভিভাবক থাকবে না এবং তোমাদেরকে সাহায্য করা হবে না।" আগের আয়াতে খোদাদ্রোহীতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও অবিচল থাকার নির্দেশ দেয়ার পর এই আয়াতে বলা হয়েছে, বিশ্বাসী মুসলমানরা যেন অমুসলিমদের প্রতি ঝুকে না পড়ে এবং তাদেরকে বিশ্বাসী বন্ধু হিসাবে গ্রহণ না করে। মুসলমানদের এটা মনে করা উচিত নয় যে, অমুসলিমরা বিপদে বা দুর্যোগকালে মুসলমানদেরকে খোলা মনে সাহায্য করবে বরং মুসলমানদের বিশ্বাস করা উচিত যে, আল্লাহই একমাত্র তাদের সাহায্যকারী। অবিশ্বাসী জালেমদের প্রতি ঝুকে পড়ার অর্থ হচ্ছে, দুনিয়ার লাঞ্ছনা এবং আখেরাতের শাস্তিকে অনিবার্য্য করে তোলা। হাদিসে বলা হয়েছে, নিজের নিকট আত্মিয় হলেও অত্যাচারী যালেমের প্রতি অনুরাগী হওয়া বা তাদের কাছ থেকে আশা করা উচিত নয়। অত্যাচারী দাম্ভিক শক্তির উপর নির্ভরশীল না হয়ে মুসলমানরা একমাত্র আল্লাহর উপর নির্ভর করবে এটাই ইসলামের মহান শিক্ষা।

এবারে এই সূরার ১১৪ ও ১১৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই দুই আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ " নামাজ যথাযথভাবে পড়বে দিনের দু-প্রান্তভাগে ও রাতের প্রথমমাংশে, সৎকর্ম অবশ্যই অসৎকর্মকে দূর করে দেয়, যারা উপদেশ গ্রহণ করে এ তাদের জন্য এক উপদেশ। তুমি ধৈর্য্য ধারণ কর-নিশ্চয় আল্লাহ পরোপকারীদের শ্রমফল নষ্ট করেন না।"
মুসলমানদেরকে নিজের বিশ্বাস ও আদর্শের উপর স্থির অবিচল থাকার নির্দেশ দেবার পর এই আয়াতে নামাজ ও আল্লাহর জিকিরের ব্যাপারে উপদেশ দেয়া হয়েছে। নামাজ বা আল্লাহর সাথে বান্দার আত্মিক সম্পর্ক যে কোন অশান্ত হৃদয়কে প্রশান্ত করে। এর মাধ্যমে মানুষ হৃদয়ের নানা কলুষতা থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। হাদিস শরীফে এসেছে, একদিন আমিরুল মোমেনীন আলী(আঃ) একদল মুসলমানকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলেন, বলুন তো কোরআনের কোন আয়াতটি হতাশা দূর করে প্রাণসঞ্চার করে? উপস্থিত সাহাবারা একেক জন একেক আয়াত উল্লেখ করলেন। হযরত আলী বললেন, নবী করিম(সাঃ) বলেছেন, সবচেয়ে বেশী আশা ও প্রাণসঞ্চারকারী আয়াত হচ্ছে, অর্থাৎ" নামাজ যথাযথভাবে পড়বে দিনের দু-প্রান্তভাগে ও রাতের প্রথমমাংশে, সৎকর্ম অবশ্যই অসৎকর্মকে দূর করে দেয়, যারা উপদেশ গ্রহণ করে এ তাদের জন্য এক উপদেশ। তুমি ধৈর্য্য ধারণ কর-নিশ্চয় আল্লাহ পরোপকারীদের শ্রমফল নষ্ট করেন না।" এরপর রাসূলে খোদা (সাঃ) বললেন, হে আলী! আল্লাহর শপথ করে বলছি যখন কেউ অজু করে তখন তার পাপগুলো ঝড়ে পড়ে, যখন কেবলা মুখী হয় তখন পবিত্রতা তাকে আচ্ছন্ন করে। হে আলী, নামাজী ব্যক্তি হচ্ছে সেই ব্যক্তির মত যে কিনা পাঁচবার ঝরণার পানিতে গোসল করে এবং দেহকে পরিচ্ছন্ন রাখে। #


কোরআনের আলো

( সূরা হুদ- পর্ব : ২৪ )

কোরআনের আলোর এ পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি পবিত্র কোরআন হচ্ছে সর্বশেষ ঐশী মহাগ্রন্থ  যাতে রয়েছে মানুষের আধ্যাত্মিক ও জাগতিক উৎকর্ষের অমূল্য নির্দেশনা পবিত্র কোরআনেই বলা হয়েছে, অর্থাৎ "কোরআন হচ্ছে বিশ্ব জগতের জন্য উপদেশ।" অন্যত্র বলা হয়েছে, অর্থাৎ "কোরআনই সকলের জন্য অনুশাসন।" খোদা প্রদত্ত এই অনুশাসন জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে শান্তি ও কল্যাণ অবশ্যম্ভাবী তাই ইহকাল ও পরকালে সৌভাগ্য নিশ্চিত করতে হলে কোরআন চর্চা করা উচিত নিয়মিত অল্প কিছুণের জন্য হলেও কোরআন অধ্যয়ন করা বা তেলাওয়াত করা উচিত নবী করিম (সাঃ) বলেছেন, "ক্ষত্র খচিত রাতের আকাশ যেমন দুনিয়াবাসীর সামনে প্রতিভাত হয়, তেমনি যে ঘরে কোরআন পাঠ করা হয় সে ঘরটি আকাশবাসীর কাছে জ্যোতির্ময় দেখায়।"

 মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের প্রত্যেকের ঘরকে কোরআনের আলোয় উদভাসিত করার তাওফিক দান করুন এই কামনা করে শুরু করছি এবারের মূল আলোচনা এবারে আমরা সূরা হুদের ১০২  থেকে ১০৭ নম্বর আয়াত পর্যন্ত আলোচনা করবো প্রথমেই ১০২ ও ১০৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক এই দুই আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ "তোমার প্রতিপালকের শাস্তি এমনই, তিনি শাস্তি দেন জনপদসমূহকে যখন তারা সীমালঙ্ঘন করে, তার শাস্তি মর্মন্তুদ ও কঠিন যে পরলোকেরা শাস্তিকে ভয় করে নিশ্চয় এতে তার জন্য নিদর্শন রয়েছে সে দিন সমস্ত মানুষকে একত্রিত করা হবে, সেদিন এমন হবে যে সকলেই সব কিছু প্রত্যক্ষ করবে।"

ফেরাউন তার দলবল সহ অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে নীল নদে নিমজ্জিত হয়ে মারা পড়েছিল, এঘটনা গত অনুষ্ঠানেই বলা হয়েছে এই আয়াতে বলা হচ্ছে, আল্লাহর গজব শুধু মাত্র ফেরাউন ও অনুসারীদের জন্যই প্রযোজ্য ছিল না বরং তা সর্বযুগেই অত্যাচারী জালেমদের জন্য প্রযোজ্য আল্লাহ তাআলা জালেম ও সীমালঙ্ঘন কারীদেরকে খুবই অপছন্দ করেন  এবং তাদের জন্য কঠোর পরিণতি নির্ধারণ করেছেন তবে যারা কর্মফল প্রাপ্তির স্থান কেয়ামত বিশ্বাস করেন তারাই অতীত ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেকে সংশোধন করে নেন যে সমাজে জুলুম ও গোয়ার্তুমী স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয় সেখানে আল্লাহর গজব অবধারিত মানুষ যখন কুফরী এবং পাপাচারে সীমা অতিক্রম করের তখনই তাদের উপর নেমে আসে ঐশী শাস্তি এছাড়াও তাদেরকে কর্মফল প্রাপ্তির স্থান পরকালে বিশেষ শাস্তি ভোগ করতে

এবারে সূরা হুদের ১০৪ ও ১০৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক এই দুই আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ " এবং আমি নির্দিষ্ট কিছু কালের জন্য ঐ দিনকে বিলম্বিত করবো, যখন সে দিন আসবে তখন আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কেউ বাক্যালাপ করতে পারবে না তাদের মধ্যে অনেকে হবে হতভাগ্য ও অনেকে হবে ভাগ্যবান।"

এর আগের আয়াতে কর্মফল প্রাপ্তির স্থান কেয়ামত সম্পর্কে বলা হয়েছে, অনেকেই বলতে পারে বাস্তবে কেয়ামত বলতে কিছু নেই এটা রূপক অর্থে বলা হয়েছে আর যদি কেয়ামত থেকেই থাকে তাহলে তা কবে সংঘটিত হবে? এসব ধারণার জবাবে এই আয়াতে বলা হয়েছে, কেয়ামত নির্ধারিত সময়ে সংঘটিত হবে এবং একমাত্র আল্লাহই সে সম্পর্কে অবগত রয়েছেন কাজেই পরকালের চিন্তা বাদ দিয়ে ইহজগত নিয়েই মেতে উঠা ঠিক নয় আয়াতে শেষভাগে বলা হয়েছে, কেয়ামতের দিন আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ কোন কথা বলার সুযোগ পাবে না নিজের পাপের জন্য অনুতাপ বা ব্যাখ্যা দেয়ারও কোন সুযোগ থাকবে না কারণ সেদিন সবই প্রকাশ্য ও প্রত্যক্ষ অবস্থায় থাকবে, কোন কিছু অপ্রকাশ্য থাকবে না মানুষের শরীরের প্রত্যেক অঙ্গ কথা বলবে নিজেদের অপকর্মের সাক্ষী দেবে কেয়ামত বা মহাপ্রলয়ের দিনক্ষণ আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে আছে এবং তা কোন সময়ে সংঘটিত হবে তা একমাত্র আল্লাই জানেন

এবারে আমরা সূরা হুদের ১০৬ ও ১০৭ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো এই দুই আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ "অতএব যারা হতভাগ্য তারা নরকে যাবে সেখানে তারা আর্তনাদ ও চিৎকার করতে থাকবে সেখানে তারা স্থায়ী হবে ততদিন পর্যন্ত যতদিন আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবী বিদ্যমান থাকবে যদি না তোমার প্রতিপালক অন্যরুপ ইচ্ছা পোষণ করেন, তোমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা তাই করেন।"

সূরা হুদের ১০৫ নম্বর আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কেয়ামতের দিনে মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত হবে, সৎ কর্মশীলদের দল যারা সে দিন হবে সৌভাগ্যের অধিকারী অপরদিকে হতভাগ্যদের আরেকটি দল থাকবে তাদেরকে নিয়ে যারা দুনিয়াতে পাপাচারে লিপ্ত ছিল সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ সকল মানুষকে পুত পবিত্র অবস্থায় সৃষ্টি করেছেন, তাদেরকে বিবেক বুদ্ধি দিয়েছেন এবং তাদেরকে সৎপথের রাস্তা দেখানোর ব্যবস্থা করেছেন এরপর প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর অনেকে ভুল পথে চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে আবার অনেকে চিন্তা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সত্যকে গ্রহণ করে নেয় পরিণতিতে একদল সৌভাগ্যবান আর অপর দল হতভাগ্য হয়ে পড়ে ফলে এটা বলা যায় যে, সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য এটা পূর্ব নির্ধারিত কোন বিষয় নয় মানুষ তার স্বাধীন ইচ্ছা শক্তির মাধ্যমে এই দুইয়ের যে  কোন একটিকে বেছে নেয় পার্থিব জগতে মানুষের অপকর্মগুলোই কেয়ামতের দিন আগুনে পরিণত হয় এবং তাকে দহন করতে থাকে এই আগুন প্রকৃতপে তারই অপকর্ম ও পাপের বাহ্যিক প্রকাশ পাপাচারী মানুষকে এই আগুন ততদিন দহন করতে থাকবে যতদিন মহান আল্লাহ তাকে মা না করবেন যাদের জীবনে কিছু পূণ্যকর্মও রয়েছে তারা তাদের শাস্তি ভোগের পর আল্লাহর নির্দেশে বেহেশতে যাবে, কিন্তু অনেকেই অনন্তকাল দোযখের আগুনে জ্বলতে থাকবে প্রকৃতপে এ ধরনের মানুষের স্বভাব প্রকৃতি হচ্ছে তারা যদি পৃথিবীতে অনন্ত জীবনের অধিকারী হতো তাহলে সারা জীবনই তারা পাপ ও অপকর্মে লিপ্ত থাকতো সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য দুটোই মানুষের কৃতকর্মের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়ে কাজেই প্রত্যেকের ভাগ্য প্রত্যেকের উপরই ন্যস্ত#


কোরআনের আলো

( সূরা হুদ- পর্ব : <