রহমতের অতিথি - ১

রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের সওগাত নিয়ে বছর ঘুরে আমাদের মাঝে আবারো হাজির হয়েছে মাহে রমজান ৷ আত্মসংযম আর আত্মশুদ্ধির কষ্টিপাথরে নিজেকে যাচাই করার ও বিশুদ্ধ করার সুবর্ণ সব সুযোগে ভরা এই মাস ৷ বেহেশতি সৌরভ ও খোদা প্রেমের ফুলেল জলসার এই রমজান মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্যে সবচেয়ে বড় রহমতের উৎসব৷ রহমতের এ উৎসব থেকে অফুরন্ত রহমত পেতে হলে খোদায়ী প্রেমের সর্বশ্রেষ্ঠ সাকীর পথ নির্দেশনা মেনে চলা একান্তই জরুরী ৷ সেই আল আরাবী সাকী তথা বিশ্বনবী রাহমাতাল্লিল আলামীন অন্য সব বিষয়ের মতো এক্ষেত্রেও আমাদের দিয়ে গেছেন স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও আলোকিত বাণী ৷ তাহলে দেরি না করে জানা যাক পবিত্র রমজানে সাফল্য, মুক্তি এবং সৌভাগ্য অর্জনের রহস্যগুলো কী কী ? বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) পবিত্র শাবান মাসের শেষ সপ্তায় পবিত্র রমজানের ফজিলত, গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, পবিত্র রমজান মাস দয়া, কল্যাণ ও ক্ষমার মাস ৷ এ মাস মহান আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ মাস ৷ এ মাসের দিনগুলো সবচেয়ে সেরা দিন, এর রাতগুলো শ্রেষ্ঠ রাত এবং এর ঘন্টাগুলো শ্রেষ্ঠ ঘন্টা ৷ এ মাস এমন এক মাস যে মাসে তোমরা আমন্ত্রিত হয়েছ আল্লাহর পক্ষ থেকে তথা রোজা রাখতে ও প্রার্থনা করতে৷ তিনি তোমাদেরকে এ মাসে সম্মানিত করেছেন৷ এ মাসে তোমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস মহান আল্লাহর গুণগান বা জিকিরের সমতুল্য; এ মাসে তোমাদের ঘুম প্রার্থনার সমতুল্য, এ মাসে তোমাদের সৎকাজ এবং প্রার্থনা বা দোয়াগুলো কবুল করা হবে ৷ তাই মহান আল্লাহর কাছে আন্তরিক ও পবিত্র চিত্তে প্রার্থনা করো যে, তিনি যেন তোমাদেরকে রোজা রাখার এবং কোরআন তেলাওয়াতের তৌফিক দান করেন৷ নিঃসন্দেহে সে ব্যক্তি প্রকৃতই দূর্ভাগা বা হতভাগ্য যে রমজান মাস পেয়েও মহান আল্লাহর ক্ষমা হতে বঞ্চিত হয় ৷ বিশ্বনবী রাহমাতুল্লিল আলামীন আরো বলেছেন, রমজান মাসে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে কিয়ামত বা শেষ বিচার দিবসের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কথা স্মরণ কর ৷ অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্রদেরকে সাহায্য কর ও সাদাকা দাও৷ বয়স্ক ও বৃদ্ধদেরকে সম্মান কর এবং শিশু ও ছোটদেরকে ৱেহ কর৷ আত্মীয় স্বজনের সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ রক্ষা কর ৷  তোমাদের জিহবাকে অন্যায্য বা অনুপযোগী কথা বলা থেকে সংযত রাখ, নিষিদ্ধ বা হারাম দৃশ্য দেখা থেকে চোখকে আবৃত রাখ, যেসব কথা শোনা ঠিক নয় সেসব শোনা থেকে কানকে নিবৃত রাখ ৷ এতিমদেরকে দয়া কর যাতে তোমার সন্তানরা যদি এতিম হয় তাহলে তারাও যেন দয়া পায় ৷ গুনাহর জন্যে অনুতপ্ত হও ও তওবা কর এবং নামাজের সময় মোনাজাতের জন্যে হাত উপরে তোলো, কারণ নামাজের সময় দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়, এ সময় মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকান, এ সময় কেউ তাঁর কাছে কিছু চাইলে তিনি তা দান করেন, কেউ তাঁকে ডাকলে তিনি জবাব দেন, কেউ কাকুতি-মিনতি করলে তার কাকুতি মিনতি তিনি গ্রহণ করেন ৷

মানবতার মুক্তির দূত বিশ্বনবী (সাঃ) রমজানের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য সম্পর্কে আরো বলেছেন,  হে মানব সকল ! তোমরা তোমাদের আত্মাকে নিজ কামনা-বাসনার দাসে পরিণত করেছো, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে একে মুক্ত করো ৷ তোমাদের পিঠ গোনাহর ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে আছে, তাই সেজদাগুলোকে দীর্ঘায়িত করে পিঠকে হালকা করো ৷ জেনে রাখ মহান আল্লাহ নিজ সম্মানের শপথ করে বলেছেন, রমজান মাসে নামাজ আদায়কারী ও সেজদাকারীদেরকে শাস্তি বা আজাব দিবেন না এবং কিয়ামতের দিন তাদেরকে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করবেন ৷  হে আল্লাহর বান্দারা ! তোমাদের যে কেউ কোনো মুমিনকে ইফতারি দেবে, আল্লাহ তাঁকে এর বিনিময়ে একজন দাসকে মুক্ত করার সওয়াব দান করবেন এবং দয়াময় আল্লাহ তাঁর অতীতের গুনাহও ক্ষমা করে দেবেন ৷

বিশ্বনবী (সাঃ)র সাহাবীরা বললেন, অন্যদেরকে ইফতারি করানোর সামর্থ আমাদের সবার নেই৷ তিনি বললেন,  রোজাদারদের ইফতারি দেয়ার মাধ্যমে জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেকে দূরে রাখ, আর সে ইফতারি যদি একটি খুরমার অর্ধেক বা এমনকি সামান্য পানিও হয়ে থাকে ৷ 

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) আরো বলেছেন, যারা এই মাসে অর্থাৎ পবিত্র রমজান মাসে নিজ ব্যবহার ও আচার আচরণকে সুন্দর করবে তারা সেদিন সহজেই পুলসিরাত পার হয়ে যাবে৷ যারা এই মাসে ভৃত্য বা অধীনস্তদের কাজ কমিয়ে দেবে মহান আল্লাহ শেষ বিচার দিবসে তার হিসাব সহজ করে দেবেন ৷ যারা এই মাসে অর্থাৎ রমজান মাসে মানুষকে বিরক্ত করা বা কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকবে, বা অন্যদের দোষ ঢেকে রাখবে, কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ নিজ ক্রোধ থেকে তাদের রক্ষা করবেন ৷ যারা রমজান মাসে এতীমকে আদর যত্ন বা সম্মান করবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদেরকে সম্মান করবেন ৷ যারা এই মাসে আত্মীয়-স্বজনের সাথে ভালো ব্যবহার করবে ও তাদের সাথে সম্পর্ক রাখবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদেরকে রহমতের ধারায় সিক্ত করবেন, আর যারা এই মাসে আত্মীয় স্বজনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে বা তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করবে আল্লাহ  শেষ বিচার দিবসে তাদেরকে নিজ রহমত থেকে বঞ্চিত করবেন

মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিশ্বনবী (সাঃ) পবিত্র রমজানের ফজিলত সম্পর্কে আরো বলেছেন, যে এই মাসে নফল নামাজ আদায় করবে আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেবেন,  যে  একটি ফরজ নামাজ আদায় করবে তাকে অন্য মাসের সত্তুরটি ওয়াজিব নামাজ আদায়ের সওয়াব দান করবেন ৷ যে কেউ এ মাসে আমার প্রতি বার বার দরুদ পাঠাবে আল্লাহ তার সৎ আমলের পাল্লা ভারী করে দেবেন ৷ আর যে ব্যক্তি এই মাসে অর্থাৎ রমজান মাসে পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত তেলাওয়াত করবে সে ব্যক্তি অন্য মাসে সমগ্র কোরআন তেলাওয়াতের সমান পরিমাণ সওয়াব পাবে ৷

 হে আল্লাহর প্রিয় বান্দারা ! এই মাসে বেহেশতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়েছে, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা কর যেন এ দরজাগুলো তোমাদের জন্যে বন্ধ হয়ে না যায়৷ এই মাসে জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করা হয়েছে, তাই আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো যেন এই দরজাগুলো কখনও তোমাদের জন্যে খুলে দেয়া না হয়৷ শয়তানগুলোকে এ মাসে হাতে পায়ে শিকল পরিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো সেগুলো যেন তোমাদের ওপর কর্তৃত্ব করতে না পারে

রমজান মাস সম্পর্কে নবী করিম (সাঃ)এর এই ভাষণের এক পর্যায়ে আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ মাসের শ্রেষ্ঠ আমল কি?”

রাসূল (সাঃ) বললেন,হে আবুল হাসান! এ মাসের শ্রেষ্ঠ কাজ বা আমল হলো নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে বিরত থাকা৷ ” #

 রহমতের অতিথি - ২

সুপ্রিয় পাঠক, পবিত্র রমজান মাসের শিক্ষা, গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কিত আলোচনায় এই মাসের ফজিলত এবং বরকত নিয়ে আমরা এর আগে আলোচনা করেছি ৷ কথা হলো, পবিত্র রমজান মাসে কি আমরা শুধু ইবাদত বন্দেগী ও আত্মশুদ্ধিতেই মগ্ন থাকবো ? নাকি ইবাদত বন্দেগী, কোরআন-তেলাওয়াত ও আত্মসংযমের চর্চার মত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর পাশাপাশি আমাদের নিজ নিজ সমাজ এবং মুসলিম উম্মাহর বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে পবিত্র রমজান মাসে আমাদের আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ করণীয় কাজ রয়েছে ? বিশেষ করে যেসব সমাজে কালোবাজারী, মজুতদারী, সন্ত্রাস, ঘূষ, অশ্লীল-তৎপরতা, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও অন্যান্য অনেক দূর্নীতি বা অসঙ্গতি বিরাজ করছে ৷ সেখানে একজন মুমিন বান্দা শুধু নামাজ-রোজা এবং আত্মশুদ্ধিতে মগ্ন থেকে রমজানের পুরো বরকত বা সওয়াব আশা করতে পারেন না ৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ ( সঃ ) বলেছেন, কোন সমাজে যদি ক্ষুধার্ত ব্যক্তি থাকেন, তাহলে সেই সমাজের লোকদের রোজা কবুল হবে না ৷  তাই স্বচছল ও ধনী রোজাদার ভাই-বোনদের ভেবে দেখা উচিত তারা অনাথ ও দরিদ্র মানুষের জন্যে কি করতে পেরেছেন ? কতটুকু দান করেছেন ? একজন ব্যবসায়ী যদি রোজার মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেন তাহলে তার রোজা কি কবুল হবে ? আর তিনি যদি এই পবিত্র মাসে অন্য সময়ের চেয়ে কিছু কম লাভ করেন, তাহলে তার এই লাভে কি বেশি বরকত হবে না ? যিনি কারখানার মালিক বা অফিসের বড় কর্মকর্তা তাঁকে ভেবে দেখতে হবে রমজান উপলক্ষ্যে তিনি শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি বা রোজাদার শ্রমিকদের শ্রমের মাত্রা কমিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন কি ?  যারা রেডিও ও টেলিভিশনের সাংবাদিক বা শিল্পী তাদেরকে ভেবে দেখতে হবে পবিত্র রমজান উপলক্ষ্যে তারা কি অশালীন বা ধর্ম-বিরোধী অনুষ্ঠান করছেন না কি মানুষের জন্যে কল্যাণকর ও খোদামুখী জীবন যাপনের আহবান সম্বলিত অনুষ্ঠান করছেন ? যিনি লেখক বা সাহিত্যিক তিনি যদি পবিত্র রমজান মাসে ইসলামের সৌন্দর্য বা পবিত্র কোরআনের আহবানকে তার শিল্পকর্ম বা লেখনীতে তুলে না ধরে অশ্লীল গল্প, উপন্যাস বা অর্থহীন কল্পনা কিংবা ভাবধারা তার সুন্দর লেখনীতে তুলে না ধরেন তাহলে এই ব্যক্তিদের কি রমজানের কোন বরকত স্পর্শ করবে ? রমজান মাসে সাধারণত দরিদ্র ও বঞ্চিত শ্রেণীকে অর্থ সাহায্য বা দান খয়রাত দেয়া উচিত ৷ অথচ বর্তমান যুগে একশ্রেণীর বিত্তশালী মানুষ ইফতার পার্টির নামে রসনা বিলাস বা ধনী ও স্বচছল শ্রেণীর ভূড়ি-ভোজনের প্রতিযোগিতায় বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন ৷ হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) বলেছেন , দরিদ্র লোকদের ক্ষুধার কষ্ট উপলব্ধি করা ও আল্লাহর নেয়ামত দরিদ্রদের সাথে নিয়ে ভোগ করার জন্যেই রমজানের রোজার বিধান দেয়া হয়েছে ৷ আরেক শ্রেণীর ধনী ও শিল্পপতি রমজান মাসে লোক-দেখানোর জন্যে যাকাতের কাপড় প্রকাশ্যে দান করার আয়োজন করেন ৷  অথচ মহান আল্লাহ দান খয়রাত গোপনে দিতে বলেছেন ৷ প্রায় প্রতি বছরই শোনা যায়, যাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে ভীড়ের চাপে বাংলাদেশের অনেক মানুষ মারা গেছে ৷  রমজান মাসে দরিদ্র লোকদেরকে এইভাবে কষ্ট দেয়া কি রমজানের শিক্ষার পরিপন্থী নয় ?  আমরা জানি পবিত্র কোরআন নাজিল হয়েছিল রমজান মাসে এবং এই পবিত্র মাসে মুসলমানরা ইসলামের ইতিহাসের প্রথম ভাগ্য নির্ধারণী বদর যুদ্ধে মক্কার মুশরিকদের  পরাজিত করেছিল ৷ এই বরকতময় মাসেই মুসলমানরা জয় করেছিল  ুসকল নগরীর মাতা হিসেবে খ্যাত পবিত্র মক্কার নগরী এবং সেখান থেকে দূর করেছিল মূর্তির প্রভূত্ব ৷ কিন্তু বর্তমান বিশ্বে এখনও রাজতন্ত্র, উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মহীনতা বা ধর্ম-নিরপেক্ষতাবাদ, পুঁজিবাদের মত বহু নতুন মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ৷  এইসব মূর্তি লালন করছেন আধুনিক যুগের আবু জাহেল ও আবু লাহাবরা ৷ আর তাদেরকেই অনুসরণ করছেন মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ ক্ষমতাসীন সরকার ও পশ্চিমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দাস বা অনুচর হিসেবে পরিচিত বিপুল সংখ্যক পশ্চিমা-শিক্ষিত মানুষ এবং তথাকথিত মুসলিম নামধারী বুদ্ধিজীবী শ্রেণী ৷ পবিত্র রমজানের শিক্ষা আমাদেরকে এইসব নব্য-মূর্তি পূজারীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার আহবান জানাচেছ ৷  তাই রমজান মাসে মুসলমানরা প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদের পাশাপাশি মুসলিম উম্মাহর অধিকার আদায়ের জিহাদেও অংশ নিয়ে রমজানের ঐতিহ্য এবং বরকতের অংশীদার হবেন এটাই সুস্থ-বিবেক সম্পন্ন মুমিনের আশা ৷  আজ ফিলিস্তিন, লেবানন, ইরাক, আফগানিস্তানসহ বিশ্বের অন্য অনেক অঞ্চলে মুসলমানরা জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে অবর্ণনীয় কষ্ট, ত্যাগ  ও ক্ষয়ক্ষতির শিকার হচেছন ৷ তাদের বেদনায় শরীক হওয়া এবং তাদের মুক্তি সংগ্রামের ও মর্যাদা অর্জনের প্রচেষ্টাকে সহায়তা করার জন্যে সর্বশক্তি দিয়ে সম্ভাব্য সব কিছু করাও একজন প্রকৃত রোজাদার মুসলমানের কর্তব্য হওয়া উচিত ৷  কারণ, ইসলাম শুধু বাহ্যিক ইবাদত-বন্দেগীর ধর্ম নয় ৷  ইসলাম অর্থ আল্লাহর কাছে ও তাঁর জীবন বিধানের কাছে পূর্ণাঙ্গ আত্মসমর্পন ৷ আর এই আত্মসমর্পনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যাদেরকে সাহায্য করা প্রয়োজন তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসা, বিশেষ করে যারা নির্যাতিত ও নিপীড়িত হচেছ তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা ৷ এ সাহায্য হতে পারে অর্থ ব্যয় ছাড়াও প্রচারের মাধ্যমে, লেখনীর মাধ্যমে, শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যমে কিংবা জালেম শক্তিগুলোর পণ্য বর্জনের মাধ্যমে ৷ বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের যে অবর্ণনীয় দুঃখজনক অবস্থা তা আমাদেরকে করণীয় কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিচেছ ৷ বরকতময় রমজান মাসে এইসব করণীয় কর্তব্য ভুলে গিয়ে শুধু নামাজ রোজার মাধ্যমে বেহেশত পাবার আশা করার কোন অবকাশ নেই ৷ #

রহমতের অতিথি - ৩

সুপ্রিয় পাঠক, বছর ঘুরে আবরো আমাদের মাঝে হাজির হয়েছে রহমত, বরকত ও মাগপেরাতের মাস মাহে রমজান ৷ রোযার  গুরুত্ব সম্পর্কে  মহান আল্লাহ বলেছেন, রোযা একান্তই আমার জন্য আর আমিই এর প্রতিদান দেবো ৷  অন্যদিকে রাসূলে করীম (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাস ও সওয়াবের আশা নিয়ে রমজান মাসে- দিনের বেলায় রোজা রাখবে এবং রাতের বেলায়  ইবাদত-বন্দেগী করবে, তার অতীত জীবনের সকল গুণাহ মাফ করে দেয়া হবে ৷

রমজান মাসের শুরু হয়েছিল অনেক বছর আগে ৷ আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যে বছর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন, তার পরের বছর অর্থাৎ দ্বিতীয় হিজরী থেকে রোযা ফরজ হয় ৷ রাসূল (সাঃ) বলেছেন, প্রতিটি জিনিসেরই একটা দরজা আছে আর ইবাদতের দরজা হলো রোযা ৷ মাহে রমজানের গুরুত্ব প্রসঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার কেন জাগাইলী তোরা কবিতায় লিখেছেন-

 

মাহে রমজান এসেছে যখন, আসিবে শবে কদর’,

নামিবে তাহার রহমত এই ধুলির ধরার পর ৷

এই উপবাসী আত্মা, এই যে উপবাসী জনগণ,

চিরকাল রোযা রাখিবে না- আসে শুভ ইফতার ক্ষণ ৷

 

অন্যদিকে কবি আজিজুর রহমান তাঁর রোযা কবিতায় লিখেছেন,

রোযা রেখে কর অনুভব

ক্ষুধার কেমন তাপ,

দেহমনের সেই সাধনায়

পুড়িয়ে নে তোর পাপ ৷

একথা সবাই জানে যে, রোযা রেখে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কিছুই খাওয়া যাবে না৷ তবে শুধু উপোস থাকলেই চলবে না ৷ রোযাদার খারাপ কথা বলবে না, পরনিন্দা করবে না ,কারো সাথে ঝগড়া বিবাদ করবে না এমনকি মিথ্যা কথাও বলবে না ৷ নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা ও  খারাপ কাজ পরিহার না করে শুধু পানাহার পরিত্যাগ করল, তার রোযা আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই ৷ সব সময় মনে রাখতে হবে, রোযা রাখা এবং একই সাথে খারাপ আচরণ করা আত্মাবিহীন দেহের মতো ৷ কিন্তু কেউ যদি গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধাতে আসে  তাহলে কি করতে হবে? এ অবস্থায় কী করতে হবে তা রাসূলে খোদার একটি বাণী থেকেই জানা যায়৷ তিনি বলেছেন, ‘কেউ যদি কাউকে গালি দেয় অথবা ঝগড়া করে তাহলে সে যেন বলে আমি রোযাদার ৷

যারা ছোটো তাদের রোযা না রাখলেও চলে ৷ কিন্তু এ মাসে বেশী করে ভাল কাজ করতে হয়, বড়দের কথা শুনতে হয় এবং বেশী বেশী আল্লাহর কথা স্মরণ করতে হয়৷ সুপ্রিয় পাঠক, আমর বিল মারুফ ও  নেহী আনিল মুনকার’-  বাক্য দুটি আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন ৷ এ বাক্য দুটির অর্থ হলো সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ৷ রমযান মাসে আল্লাহর এ নির্দেশ দুটো বাস্তবায়ন করা সহজ৷ তাই সবার সাধ্যানুযায়ী  পরিবার পরিজন,বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয় স্বজনকে সৎ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে৷ পাশাপাশি সকল অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে তাদেরকে বিরত থাকার আহবান জানাতে হবে ৷

রোযাদারদের জন্য দুটি খুশির সময় রয়েছে৷ একটি হলো ইফতারের সময়; আরেকটি হলো আল্লাহর সাথে যখন তার সাক্ষাৎ হবে তখন৷ সারাদিন রোযা রাখার পর সূর্য ডোবার পর যে খাবার খাওয়া হয়, তাকে ইফতার বলা হয়৷ ইফতার তৈরী ও সাজিয়ে রাখার ক্ষেত্রে মাকে সাহায্য করা খুব ভাল কাজ৷ এছাড়া বাড়ীতে কোন মেহমান এলে তাকে ইফতার দেয়া, বাড়ীর আশেপাশে প্রতিবেশী; এমনকি মসজিদে সমবেত মুসুল্লীদের জন্য ইফতার পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ছোটরা ভূমিকা রাখতে পারে৷ আর হ্যাঁ, যারা এতিম কিংবা মিসকিন তাদেরকে ইফতার দিতে হবে সবার আগে৷

রমজান মাসে পবিত্র কুরআন নাজিলের মাস৷ এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘রমজান মাস৷ এ মাসে কুরআন মজীদ নাযিল হয়েছে৷ এটি হলো গোটা মানব জাতির জন্য জীবন যাপনের বিধান এবং এমন সুস্পষ্ট উপদেশাবলীতে পরিপূর্ণ যা সঠিক ও সত্য পথ প্রদর্শন করে এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে৷ তাই রমজান মাসে কুরআন তেলাওয়াত করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ৷ যারা কুরআন পড়তে পারেন তারা এ মাসে সম্পূর্ণ কুরআন একবার হলেও খতম করার চেষ্টা করবেন৷ আর যারা কুরআন পড়তে পারেন না তারা এ মাসে কুরআন পড়া শিখতে পারেন৷  মনে রাখবেন নফল ইবাদতগুলোর মধ্যে কুরআন তেলাওয়াতই সবচেয়ে উত্তম  ইবাদত৷

এবার আমরা রোযার পুরষ্কার সম্পর্কে খানিকটা আলোচনা করবো৷ রাসূল (সাঃ) বলেছেন, জান্নাতের মধ্যে আটটি দরজা আছে৷ এর মধ্যে একটি দরজার নাম রাইয়ান৷ এ দরজা দিয়ে কেবল রোযাদার ব্যক্তিরাই প্রবেশ করতে পারবে৷ সেদিন এই বলে ডাক দেয়া হবে- রোযাদার কোথায়? তারা যেন এই পথে বেহেশতে প্রবেশ করে৷ এভাবে সকল রোযাদার ভিতরে প্রবেশ করার পর দরজাটি বন্ধ করে দেয়া হবে৷ রাসূলে খোদা আরো বলেছেন, রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহতায়ালার কাছে মেশ্‌ক হতেও পবিত্র ও সুগন্ধিময়৷ সুতরাং রোযা অবস্থায় কেউ যেন অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবং ঝগড়া বিবাদ না করে৷

তো, পবিত্র মাহে রমজান তোমাদের সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল আনন্দ আর পবিত্রতার ফল্গুধারা এ কামনা করছি৷ পরিশেষে কবি ফজলে খোদার ভাষায় বলতে চাই-

হে রমজান,হে রমজান!

দাও স্বস্তি দাও শান্তি

ধরণীকে করো মনোরম,

তোমারে হেরিয়া বিশ্ব-বিবেক

সংযম হোক দুর্দম ৷

( ৫ই অক্টোবর ২০০৬ রংধনু আসরে প্রচারিত)

 

রহমতের অতিথি - ৪

সুপ্রিয় পাঠক, পবিত্র রমজান মাসের দিনগুলোতে দোয়ার অশেষ গুরুত্বের কারণে দোয়ার দর্শন নিয়ে আজ কিছু কথা বলবো ৷ স্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্কের জগতে মানুষ অনন্য সৃষ্টি ৷ মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব তথা আশরাফুল মাখলুকাত ৷ মহান আল্লাহ মানুষকে ইচছার স্বাধীনতা দিয়েছেন এ কারণেই ৷ যদিও এ ইচছার স্বাধীনতায় অপব্যাবহার তার আত্মার গঠন ও প্রকৃতিকে করে কলুষিত  ৷ কিন্তু মানুষের আত্মার মূল প্রকৃতি তথা ফিতরাত যদি কলুষিত না হয়, তাহলে নিজ স্রষ্টার প্রতি তাঁর আকর্ষণ হয় অনিবার্য ও অপ্রতিরোধ্য ৷ যেমনটি নদী ছুটে যায় সাগরের দিকে এবং পাখী ফিরে আসে তার নীড়ে, তেমনি মহান আল্লাহর প্রেম ও করুণার সাগরের দিকে মানুষের আকর্ষণকে দুনিয়ার জীবনের হাজারো প্রতিকূলতা, ব্যথা-বিচেছদ বা দ্বন্দ্ব - সংঘাত ঠেকিয়ে রাখতে পারে না ৷ দুনিয়ার জীবনের ক্লান্তিকর পথ-চলা ও বিপদ সংকুল অভিযাত্রায় মানুষ মহান আল্লাহকে পায় নিরাপত্তা এবং প্রশান্তির নিশ্চিত আশ্রয়স্থল হিসেবে ৷ একমাত্র মাহন আল্লাহই কোন কিছুর মুখাপেক্ষী নন ৷ তাই তাঁর ওপর ভরসা ও আশা করেন যাঁরা , তাঁরা হতাশার সাগরেও দেখতে পান আশার প্রজ্জোলতম আলোক ধারা ৷ মহান আল্লাহর ওপর ভরসা এমন এক আশ্রয় যা ভীরু , দ্বিধাগ্রস্ত ও অস্থির চিত্তের মানুষকেও করে দৃঢ়-চিত্ত এবং প্রশান্ত ৷ আল্লাহর ভরসার আশ্রয় মুহুর্তের মধ্যে স্রষ্টা ও মানুষের মধ্যে সংযোগ প্রতিষ্ঠা করে এবং তার জন্যে আল্লাহর অদৃশ্য ভান্ডার থেকে প্রবাহিত হয় রহমতের অজস্র স্রোতস্বীনী ৷ ফলে মিটে যায় তার সমস্ত চাহিদা ও সমস্যা ৷

নিশ্চিত মৃত্যুর দোরগোড়ায় বসেও কোন অসুস্থ ব্যক্তি যখন তাঁর  সমস্ত মনোযোগ ও আশাকে মহান আল্লাহর দিকে কেন্দ্রীভূত করে এবং অশ্রু ঝরায়, তখন আল্লাহর অক্ষয় শক্তি তাকে সারিয়ে তোলে ৷ তবে প্রার্থনা বা দোয়ার উচচতম পর্যায়ে প্রার্থনাকারী নিজেকে ও তাঁর চাহিদাগুলোকে ভুলে যায় ৷  এ পর্যায়ে দোয়ার যে মাধুর্য বা আনন্দ তা সে সারা দুনিয়ার বাদশাহীর বিনিময়েও হাতছাড়া করতে প্রস্তুত নয় ৷ কারণ, এ পর্যায়ে প্রার্থনাকারীর জন্যে আল্লাহর দোয়ার উন্মুক্ত হয়ে যায় বলে তার আর কোন কিছুই চাওয়ার থাকে না ৷ আল্লাহর কাছে দোয়া বা প্রার্থনায় আত্মিক উৎকর্ষতার একটি কারণ হলো, দোয়ার মাধ্যমে সব সময়ই আল্লাহর কাছে মুখাপেক্ষী ও দরিদ্র থাকার চেতনা বজায় থাকে  ৷ হযরত ইমাম হোসাইন ( আঃ)  আরাফাতের ময়দানে যাবালুর রহমত নামক পাহাড়ের পাদদেশে আল্লাহর কাছে মোনাজাতের সময় বলেছিলেন, হে আমার প্রভু, আমি যখন সহায়-সম্পদের অধিকারী ছিলাম তখনও তোমার মুখাপেক্ষী ছিলম, আর দূরবস্থার সময় কিভাবে তোমার মুখাপেক্ষী না হয়ে থাকতে পারি ? দোয়া স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে সম্পর্কের সেতুবন্ধন ৷ এক হাদিসে দোয়াকে ইবাদতের সারবস