|
|
|
মাহে রমজানের তাৎপর্য রমযানের মূল আরবী শব্দটি হলো রামাদান ৷ রাম্দ্ অর্থাৎ রা-মিম-দোয়াদ্ এই শব্দমূল থেকেই রামাদান শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে ৷ আরবী ভাষায় এর অর্থ হচেছ ভীষণ গরম, কঠোর সূর্যের তাপ,তৃষ্ণা এবং গলে যাওয়া ইত্যাদি ৷ নবী করিম ( সা ) থেকে উদ্ধৃত হয়েছে যে, রমযান মাসে যেহেতু গুনাহ বা পাপ বিমোচিত হয় এবং মানুষের সকল গুনাহ গলিয়ে নিঃশেষ হয়ে যায় সেজন্যেই এই মাসের নাম রমযান ৷ মঈনের অভিধানে বরকত শব্দটির অর্থ করা হয়েছে পূণ্য বা নেয়ামত বৃদ্ধি পাওয়া ৷ আরবী ভাষায় স্থির,দৃঢ় এবং অব্যাহত ফায়দা বা লাভ অর্থে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয় ৷ বরকতের অবশ্য বস্তুগত এবং আধ্যাত্মিক উভয় রূপই রয়েছে৷ বস্তুগত রূপ যেমন পানি,রুটির প্রাচুর্য ইত্যাদিও বরকত৷ আবার এর আধ্যাত্মিক রূপ চিন্তা করতে গেলে মূল্যবান এবং অর্থবহ জীবন,উত্তম বা নেক সন্তান,কোনো কাজের সফল সমাপ্তি,আধ্যাত্মিক এবং আন্তরিক পূর্ণতা লাভ ইত্যাদির কথা বলা যায়৷ এদিক থেকে রমযান মাস হলো বরকতের মাস কেননা মানুষের গুনাহগুলোকে গলিয়ে দিয়ে তার আত্মিক এবং আধ্যাত্মিক পূর্ণতার ক্ষেত্র সৃষ্টি করে এই রমযান ৷ কোরআনে কারীমে অবশ্য এই বরকত অর্জনের শর্ত হিসেবে বিশেষ করে আধ্যাত্মিক বরকত লাভের শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে,অবশ্যই বরকত প্রত্যাশীর ঈমান এবং তাকওয়া থাকতে হবে ৷ অবশ্য রোযা রাখার উদ্দেশ্যটাও গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং ঈমান ও তাকওয়া অর্জন করা বৈকি ৷ নৈলে রমযান মাসে পানাহার থেকে বিরত থাকার পেছনে যদি আধ্যাত্মিক বরকতের কোনো লক্ষ্য না থাকে কিংবা এর মাধ্যমে যদি তাকওয়া অর্জিত না হয় তাহলে এই রোযা কেবলি দৈহিক রোযা হবে,দেহের বাইরে এই রোযার আর কোনো তাৎপর্যই থাকবে না ৷ তাই এই রমযান মাসের ফযীলত থেকে উপকৃত হতে হলে ক্ষুধা-তৃষ্ণার বাইরেও সকল প্রকার খারাপ কাজ থেকে আত্মরক্ষা করতে হবে ৷ পঞ্চেন্দ্রিয়কে সংযত রাখতে হবে৷ তবেই আমরা রমযানের অর্থবহ রাত্রিগুলো এবং আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ দিনগুলোকে যথার্থভাবে কাজে লাগাতে পারবো ৷ আর তা হলেই আমরা প্রকৃত রোযাদার হিসেবে পরিগণিত হবো ৷ রমযানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করা৷ প্রকৃতপক্ষে রমযান মাসের এতো ফযীলত এবং গুরুত্বের কারণ হলো এ মাসেই নাযিল হয়েছিল মহাগ্রন্থ আল-কোরআন৷ আর রোযা কোরআনের অসংখ্য নিদর্শনের মধ্যেএকটিমাত্র আয়াত বা নিদর্শন হিসেবে পরিগণিত৷ পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, '' অনুনাযযিলু মিনাল কুরআনি মা হুয়া শিফাউঁ ওরাহমাতুল্লিল মুমেনীন'' অর্থাৎ-: " আর আমরা কোরআনের মধ্যে বিশ্বাসীদের জন্যে শেফা বা উপশম এবং রহমত বা করুণা অবতীর্ণ করেছি৷” এই মাসের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ ফযীলত হলো এসতেগফার ৷ নবী করীম ( সা ) থেকে উদ্ধৃত যে এ মাসের সর্বোত্তম দোয়া হচেছ এসতেগফার৷ এসতেগফার মানে হলো ক্ষমা প্রার্থনা করা,দোয়া করা ৷ কেননা আন্তরিকতার সাথে কায়-মনোবাক্যে যদি এসতেগফার করা হয় তাহলে তার গুনাহ মাফ হয়ে যায়৷ অনুতপ্তদের ওপর দয়া করা,আত্মীয়-স্বজনদের ওপর দয়া করা,ইফতারী দেওয়া,নফল নামায পড়া,তাহাজ্জুদ নামায পড়া ইত্যাদি এ মাসের অন্যান্য ফযীলতপূর্ণ কাজের অন্তর্ভুক্ত ৷ এসব ইবাদাতের মাধ্যমে মুমিনগণ বস্তুগত এবং আধ্যাত্মিক বরকত লাভ করতে পারে ৷ রমযান মাসে বিভিন্ন উপলক্ষ্য রয়েছে ৷ এ মাসেই কয়েকজন নবীর ওপর কিতাব নাযিল হয়েছিল৷ হযরত ইব্রাহীম ( আ ) এর ওপর নাযিল হয়েছিল সহীফা,ইঞ্জিল শরীফ নাযিল হয়েছিল হযরত ঈসা ( আ ) এর ওপর, হযরত দাউদ ( আ ) এর ওপর নাযিল হয়েছিল যবুর শরীফ,আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো এ মাসেই পবিত্র কোরআন নাযিল হয়েছিল সর্বশেষ ও শ্রেষ্ঠনবী হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) এর ওপর ৷ এমনকি এমাসেই রয়েছে বছরের শ্রেষ্ঠতম রাত পবিত্র কদরের রাত৷ পবিত্র রমযান মাসে জন্ম নিয়েছেন কয়েকজন নবী এবং নিষপাপ ইমাম৷ অপরদিকে হযরত আলী ( আ ) এর শাহাদাত এবং উম্মুল মোমেনীন হযরত খাদীজা ( সা ) এর ওফাত হয়েছিল এ মাসেই৷ ইরানের ইসলামী বিপ্লবের স্থপতি ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর পক্ষ থেকেও এ মাসে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস ঘোষণা করা হয়েছে ৷ সেটা হলো কুদস দিবস৷ ইমাম বলেছেন-‘কুদস দিবসটিকে জীবিত রাখা মুসলমানদের কর্তব্য৷ কোনো স্বাধীনচেতা মানুষই ইসরাইলকে মেনে নেবে না ৷’ রমযানের শেষ শুক্রবারকে ‘বিশ্ব কুদস দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে ৷ কুদস দিবসের আহবানের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে ব্যাপক ইসলামী জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে ৷ বিশেষ করে কুদস শরীফ পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে মুসলমানদের মাঝে ব্যাপক সাড়া জেগেছে ৷ এ বছরও নিশ্চয়ই বিশ্বব্যাপী এ দিবসটি ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হবে ৷ বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের মাঝে এরকম গণজাগৃতির ফলে একদিন নিশ্চয়ই কুদস শরীফ পুনরায় মুসলমানদের হাতে ফিরে আসবে৷ বরকতপূর্ণ এ মাসে বেহেশতের দরোজা খুলে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে বেঁধে রাখা হয়৷ তাই এই মাসে আমাদের উচিত উন্মুক্ত মন নিয়ে আল্লাহর দরবারে যথাযথ আন্তরিকতার সাথে গুনাহ মুক্তির জন্যে বেশি বেশি দোয়া করা ৷ সেইসাথে মুসলমানদের বিজয় , কুদস শরীফ মুক্তি এবং মুসলিম বিশ্বের উন্নতি কামনা করেও বেশি বেশি দোয়া করা উচিত ৷ ( আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর-২০০৭)
|
|